ঢাকা: বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিট বিক্রি শুরুর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আসন উধাও হয়ে যাওয়া এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির পেছনে উঠে এসেছে প্রযুক্তিগত জালিয়াতি ও অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের ভয়াবহ চিত্র। 

এআই-চালিত প্রোগ্রাম বা ‘বট’ (Bot) ব্যবহার করে টিকিট আটকে রাখা এবং চড়া দামে বিক্রির গুরুতর অভিযোগে টিকিট বিক্রির চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেইউ’-এর ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে।  পাশাপাশি, বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জালিয়াতি ও অডিট আপত্তির মুখে নতুন টিকিটিং এজেন্সি নিয়োগে আগাম দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

অডিট রিপোর্টে অনিয়ম ও শতাধিক ‘অ্যাডমিন’ অ্যাকাউন্ট
সম্প্রতি পরিবহন নিরীক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত অডিট প্রতিবেদনে রেলের অনলাইন টিকিটিং সিস্টেমের চরম নিরাপত্তাহীনতা ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। অডিটে দেখা যায়, টিকিট বিক্রির জন্য প্রায় ১৬৯টি ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যাকাউন্ট’ সক্রিয় ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টিকিট বিক্রি শুরুর আগেই আসন হোল্ড বা আটকে রাখা হতো।

গত ১১ অক্টোবরের এক অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, ‘বুকমাইরেলবিডিডটকম’ (bookmyrailbd.com) নামে একটি অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বট প্রযুক্তি ব্যবহার করে টিকিট কালাবাজারি চালানো হচ্ছিল। অভিযোগ রয়েছে, সহজের কর্মী এবং রেলের বুকিং সহকারী বা টিকিট মাস্টারদের পারস্পরিক যোগসাজশেই এ কারবার পরিচালিত হতো।

সহজের বিরুদ্ধে রেলের কড়া পদক্ষেপ
রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন জানান, গত সপ্তাহে অডিট রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর সহজের কাছে লিখিত জবাব চাওয়া হয়েছে। কালাবাজারিতে সহজের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিয়ে তিনি বলেন, একাধিক বিষয়ে প্রমাণ মিলেছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জালিয়াতি ঠেকাতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু বড় পদক্ষেপ নিয়েছে রেলওয়ে।  যেসব স্টেশনে সহজের কর্মীদের হাতে অ্যাডমিন সুবিধা ছিল, সেগুলো এখন থেকে রেলের নিজস্ব পরিচালন ও বাণিজ্যিক বিভাগের অধীনে নিয়ে আসা হচ্ছে।

সহজ ডটকম দীর্ঘদিন ধরে টিকিট কারসাজি করে আসছিল ...
অননুমোদিত ওয়েবসাইট বন্ধে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) চিঠি দেওয়া হয়েছে।  কালাবাজারির সন্দেহে প্রায় ১০ হাজার মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) সিস্টেম থেকে ব্লক করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সহজ লিমিটেডের সিইও লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) আমিনুল হক জনসংযোগ এজেন্সির মাধ্যমে জানিয়েছেন, তারা অডিট পর্যবেক্ষণের জবাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনায় থাকায় তারা বিস্তারিত মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলেও অডিট প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

আর্থিক অনিয়ম ও আগাম বিদায়ের ঘণ্টা
২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত নিরীক্ষায় শুধু প্রযুক্তিগত জালিয়াতিই নয়, উঠে এসেছে বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মও। অনলাইন টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমায় ঘাটতি ছাড়াও, ধীরগতির সার্ভার ও যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য সহজের কাছে বকেয়া পড়া ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা সরাসরি আদায় না করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত থাকলেও রেল কর্তৃপক্ষ আগামী সপ্তাহের মধ্যেই নতুন টিকিটিং এজেন্সি নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে।

ডিজিটাল টিকিটিং ও গ্রাহক সুরক্ষায় নতুন চ্যালেন্জ
প্রযুক্তিভিত্তিক টিকিটিং জালিয়াতি কেবল বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব ক্ষতি করছে না, বরং কোটি কোটি সাধারণ যাত্রীর দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল ঠিকাদার পরিবর্তন বা সাইট বন্ধ করে কালাবাজারি বন্ধ করা যাবে না; বরং প্রয়োজন আধুনিক প্রটেকশন মেকানিজম।

১. ক্যাপচা ও মাল্টি-ফ্যাক্টর সিকিউরিটি: এআই বা বট দিয়ে স্বয়ংক্রিয় টিকিট বুকিং ঠেকাতে ক্যাপচা (CAPTCHA) ও শক্তিশালী রিয়েল-টাইম ভেরিফিকেশন চালু করা।
২. অ্যাডমিন অ্যাকসেস নিয়ন্ত্রণ: সিস্টেমে মানুষের হস্তক্ষেপ বা সিট হোল্ড করার ক্ষমতার ওপর কঠোর সেন্ট্রাল মনিটরিং রাখা।
৩. কঠোর আইনি দৃষ্টান্ত: কালাবাজারির সাথে জড়িত প্রযুক্তিবিদ ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

রেলযাত্রীদের ভোগান্তি দূর করতে স্বচ্ছ ও নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে যাত্রীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের মূল দাবি।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ২৪ অক্টোবর ২০২৬