ইসরায়েলের মসনদে কি নতুন মুখ?
- ‘দাহিয়া মতবাদ’ থেকে রাজনীতির ময়দান: কে এই আইজেনকট, ফিলিস্তিন প্রশ্নে কী তার অবস্থান?
- নেতানিয়াহুর বড় চ্যালেঞ্জ আইজেনকট: সরকার গঠনের ডাক পেলেও জটিল সমীকরণে আটকে আছে ‘মিজরাহি’ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন
➤ চার দশকের সামরিক জীবন শেষে রাজনীতির ময়দানে পা রেখেছেন মাত্র চার বছর আগে। আর এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি উঠে এসেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে। তিনি গাদি আইজেনকট—ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান এবং বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক দল ‘ইয়াশার’-এর প্রধান।
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে আরবসহ অন্যান্য দলের সমর্থন পেয়ে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছ থেকে এরই মধ্যে সরকার গঠনের ডাক পেয়েছেন তিনি।
তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও তার সামনে রয়েছে অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ। পাশাপাশি, ফিলিস্তিন প্রশ্নেও তার অবস্থান বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টর নীতির চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়।
মরক্কোর অভিবাসী পরিবার থেকে সেনাপ্রধান
১৯৬০ সালে ইসরায়েলের তিবেরিয়াস শহরে জন্ম আইজেনকটের। তার বাবা-মা মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী ছিলেন। ইসরায়েলের সমাজে তিনি ‘মিজরাহি’ বা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ইহুদিদের প্রভাব বেশি থাকায় তার এই পরিচয় রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সফল হলে তিনি হবেন ইসরায়েলের প্রথম মিজরাহি বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী।
১৯৭৮ সালে গোলানি পদাতিক ব্রিগেডে যোগ দেওয়ার পর দীর্ঘ ৪১ বছর তিনি সামরিক বাহিনীতে কাজ করেছেন। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) ২১তম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
‘দাহিয়া মতবাদ’ ও সামরিক কঠোরতা
আইজেনকটের সামরিক পরিচয়ের অন্যতম বিতর্কিত অংশ হলো ‘দাহিয়া মতবাদ’। ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের পর তিনি যখন উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন, তখন এই কৌশলের উদ্ভব ঘটে।
এই মতবাদের মূল কথা হলো—হিজবুল্লাহ বা কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাত হলে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ব্যাপক ও অসম মাত্রার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা এবং বেসামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়ে যুদ্ধের চড়া মূল্য বুঝিয়ে দেওয়া। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই নীতি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
এছাড়া সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী এবং গাজা সীমান্তে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ দমনেও তার কঠোর সামরিক নীতি আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সামরিক পোশাক ছেড়ে রাজনীতিতে
২০২২ সালে বেনি গান্টজের ‘ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি’তে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে আসেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন ঐক্য সরকারে যোগ দেন। কিন্তু গাজা যুদ্ধ পরিচালনা ও জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে চরম মতবিরোধের জেরে ২০২৪ সালের জুনে তিনি সরকার থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব দল ‘ইয়াশার’ (অর্থ: সোজা বা ন্যায্য)।
ব্যক্তিগত জীবনেও আইজেনকটকে যুদ্ধের চরম মূল্য চোকাতে হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় সামরিক অভিযানে তার ছেলে গাল এবং তার দুই ভাতিজা নিহত হন।
ফিলিস্তিন ও গাজা প্রশ্নে অবস্থান
নেতানিয়াহুর বিচারব্যবস্থা সংস্কার বা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দখলের সমালোচনা করলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে আইজেনকটের অবস্থান মোটেও শান্তিবাদী নয়। তিনি ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কট্টর বিরোধী। পশ্চিম তীরে তিনি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পক্ষে।
গাজার ক্ষেত্রে তার নীতি আরও কঠোর। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে হামাসের শাসনের অবসান ঘটাতে হবে। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা অনুযায়ী হামাস ক্ষমতা না ছাড়লে সামরিক অভিযান চালিয়ে তাদের ধ্বংস করার পক্ষে অবস্থান তার। অর্থাৎ, তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার বা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার বিষয়ে কোনো নমনীয়তার আশা নেই।
সরকার গঠনের জটিল সমীকরণ
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ১২০ আসনের নেসেটে আইজেনকটের দল ২১টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তার নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮ আসন, আর নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩ আসন।
৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কারও নেই। দুই আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক জোটের সমর্থনে প্রেসিডেন্ট তাকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন এবং এজন্য ২৮ দিন সময় বেঁধে দিয়েছেন।
কিন্তু এখানেই মূল রাজনৈতিক জটিলতা। আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া তিনি সরকার গঠন করতে পারবেন না। আবার তিনি শর্ত দিয়েছেন যে, ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করা এবং হামাসের শাসন ক্ষমতা বিলুপ্ত করার নীতিতে সম্মতি না দিলে কোনো আরব দল তার সরকারে অংশ নিতে পারবে না। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর সঙ্গেও তিনি ঐক্য সরকার গঠন করতে রাজি নন।
অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের সামরিক সেবায় বাধ্য করার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, সেটিও উগ্র-ডানপন্থি ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত তৈরি করতে পারে।
ফলে, সামরিক বাহিনীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও জটিল এই রাজনৈতিক মেরুকরণ সামলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কি না এবং জোটকে টিকিয়ে রাখতে পারবেন কি না—সেটিই এখন ইসরায়েলের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০৮ নভেম্বর ২০২৬