রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ উদ্ধারে এবার ‘স্বতন্ত্র ঋণ উদ্ধার কৌশল’ নিয়ে মাঠে নামছে অর্থ মন্ত্রণালয়। খাতা-কলমে হিসাব মেলানোর পুরনো রীতি বাদ দিয়ে আগামী ১৪ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে সরাসরি ‘নগদ টাকা’ আদায়ের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং এমডিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই রোডম্যাপ চূড়ান্ত হয়।

পরিকল্পনাটি কাগজে-কলমে কড়া হলেও বাস্তবতা বেশ কঠিন। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের বড় অংশই ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের পকেটে, যার অনেকটাই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ স্পষ্ট করেই বলেছেন, যে অর্থ দেশেই নেই, তা উদ্ধারে এই ১৮ মাসের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করা 'অত্যন্ত দুরূহ'। খেলাপি ঋণের এই দুষ্টচক্র ভাঙতে না পারলে ব্যাংকের চড়া সুদের হার কমানোও সম্ভব নয়।

নতুন রোডম্যাপের সুনির্দিষ্ট কৌশল ও নির্দেশনা:
শীর্ষ ২০ খেলাপির জন্য ‘ব্যক্তিগত ফাইল’: সবাইকে এক নীতিতে মাপার ব্যর্থ কৌশল থেকে সরে আসছে মন্ত্রণালয়। প্রতিটি বড় গ্রাহকের বকেয়া ঋণ, জামানত, আইনি অবস্থা এবং আদায়ের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে শীর্ষ ২০ খেলাপির প্রত্যেকের জন্য আলাদা উদ্ধার কৌশল (ব্যাংক হিসাবভিত্তিক রেজল্যুশন কৌশল) তৈরি করতে হবে।

রাষ্ট্রায়াত্ত কয়েকটি ব্যাংক। ছবি: সংগৃহীত
‘নগদ আদায় টিম’ গঠন: প্রতিটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য সুনির্দিষ্ট টিম থাকবে। তাদের মাসিক নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হবে। শাখাভিত্তিক এই আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি করবে পরিচালনা পর্ষদ। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক কর্মমূল্যায়নে (এসিআর) এই নগদ আদায় ও খেলাপি রোধের বিষয়টি যুক্ত থাকবে।

ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ, পুনর্গঠন বা নিয়মিতকরণের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণ কমানো দেখানোর দিন শেষ। তারল্য সংকট কাটাতে প্রকৃত ‘নগদ আদায়’-এর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

যারা প্রকৃত সংকটে আছেন অথচ ব্যবসা চালানোর সক্ষমতা রাখেন, কেবল তারাই পুনঃতফসিল বা এককালীন এক্সিট সুবিধা পাবেন। ইচ্ছাকৃত খেলাপি বা অর্থ পাচারকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না; তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্সিট সুবিধা দেওয়ার আগে জামানত বিক্রি করে কত টাকা উঠবে, তা যাচাই করা বাধ্যতামূলক।

মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে ব্যাংকগুলোকে ‘অর্গানিক ক্যাপিটাল জেনারেশন’ বা নিজস্ব আয় বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী আয় সংগ্রহ, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ফি-ভিত্তিক আয় এবং কম সুদের স্থিতিশীল আমানত বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

শুধু ঋণ বিতরণের সংখ্যা না বাড়িয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি, নারী উদ্যোক্তা ও কৃষি খাতে উৎপাদনমুখী ঋণ বাড়াতে বলা হয়েছে। প্রতিটি শাখাকে মাসে অন্তত দুটি যোগ্য সিএমএসএমই (CMSME) ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, তবে তা বিতরণের আগে গ্রাহকের পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে নিতে হবে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬