প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন

>> প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নাকি রাজনৈতিক স্বার্থ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চার ইউনিয়নের স্মারকলিপি ও ডিসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন 

>> জনস্বার্থ গোপন বনাম আইনি জবাবদিহি: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উপজেলা পুনর্গঠনের প্রস্তাবে উত্তাল চার ইউনিয়ন

➤ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও বিজয়নগর উপজেলার প্রশাসনিক মানচিত্র পুনর্গঠন এবং নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় জনগণের মধ্যে। 

সদর উপজেলার রামরাইল, সুলতানপুর, বাসুদেব এবং বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল—এই চার ইউনিয়নকে বর্তমান প্রশাসনিক এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন হাজারো এলাকাবাসী।

বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ এবং জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচির মাধ্যমে ক্ষুব্ধ অধিবাসীরা স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। তাদের দাবি, জনগণের মতামত ও ভৌগোলিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক স্বার্থে এই বিচ্ছিন্নকরণের প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।

গোপন নথি ও জেলা প্রশাসকের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

ঘটনার মূল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো একটি নির্দেশনামূলক চিঠিকে কেন্দ্র করে। নতুন উপজেলা গঠনের সম্ভাব্যতা, সীমানা নির্ধারণ ও ভৌগোলিক বাস্তবতা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। অভিযোগ উঠেছে, অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এই চিঠিটি প্রায় এক মাস ধরে চেপে রেখেছেন জেলা প্রশাসক।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় ওলামা ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন জেলা প্রশাসকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ওলামা ঐক্য পরিষদ এমনকি জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবর্তনের তথ্য জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখা কিংবা ফাইল আটকে রাখার পেছনে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মহলকে সন্তুষ্ট করার মনস্তত্ত্ব কাজ করছে কি না, তা নিয়ে গোটা জেলায় সৃষ্টি হয়েছে তোলপাড়।

সীমানা নির্ধারণের আন্দোলনে উত্তাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া
তথ্যের অধিকার, সংবিধান ও সরকারি জবাবদিহি

প্রজাতন্ত্রের একজন আমলা বা জেলা প্রশাসক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, সংসদ সদস্য বা প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতিনিধি নন; তিনি রাষ্ট্র ও জনগণের সেবক। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত চিন্তা ও বাকস্বাধীনতা এবং ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’-এর আওতায় জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো প্রশাসনিক উদ্যোগের তথ্য জানার আইনি অধিকার নাগরিকদের রয়েছে।

উপজেলা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় যেসব প্রাথমিক মানদণ্ড থাকা আবশ্যক:

  • জনসংখ্যা ও আয়তন: প্রস্তাবিত এলাকার নাগরিক সুবিধা বাড়াবে নাকি দূরত্ব ও দুর্ভোগ তৈরি করবে।
  • যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা: নতুন জেলা বা উপজেলা গঠন রাজস্ব ও যাতায়াতের দিক থেকে কতটা যুক্তিযুক্ত।
  • জনমত ও অংশীজন পরামর্শ: স্থানীয় মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ মতামত গ্রহণ।

এই মানদণ্ডগুলো তোয়াক্কা না করে গোপনীয়তার অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।

নতুন মাত্রা ও নাগরিক প্রত্যাশা

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ সরকারের উন্নয়ন নীতির অন্যতম অংশ হলেও তা যেন কোনো রাজনৈতিক নেতার ব্যাক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার না হয়—এমনটাই দাবি আন্দোলনকারীদের।

যদি সত্যিই কোনো নেতার বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে জনমত উপেক্ষা করে চার ইউনিয়নকে বিচ্ছিন্ন করার পাঁয়তারা চলে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ওই অঞ্চলের জনজীবনে প্রশাসনিক জটিলতা ও অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলবে।

সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের তাগিদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমনে এবং প্রশাসনিক সততা পুনরুদ্ধারে অনতিবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

১. চিঠির প্রকাশ ও ব্যাখ্যা: জেলা প্রশাসককে অবিলম্বে উক্ত চিঠির আইনি ও প্রশাসনিক অগ্রগতি সম্পর্কে গণমাধ্যম ও জনগণকে স্পষ্ট তথ্য প্রদান করতে হবে। 

২. গণশুনানির আয়োজন: বিতর্কিত চার ইউনিয়নের অধিবাসীদের মতামত নিতে উন্মুক্ত গণশুনানির ব্যবস্থা করা। 

৩. নিরপেক্ষ তদন্ত: প্রশাসনিক গাফিলতি বা তথ্য গোপনের পেছনে কোনো অনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বা বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে তদন্ত নিশ্চিত করা।

জেলা প্রশাসন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষমতার মহড়া দেখানোর জায়গা নয়; এটি জনগণের আস্থার প্রতীক। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রশাসনকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে সংবিধান, আইনি প্রক্রিয়া এবং জনস্বার্থের কাছেই দায়বদ্ধ থাকতে হবে। ◉ 

নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০২ নভেম্বর ২০২৬