ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাসায়নিক সারের ডিলারশিপ নিয়োগকে কেন্দ্র করে চরম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। গত ৮ অক্টোবর চূড়ান্ত ডিলারদের তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। অনিয়মের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকের (ডিসির) কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন বঞ্চিত ব্যবসায়ীরা।
সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির ঘটনাটি ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনে। সেখানে সংসদ সদস্য আবদুল হান্নানের নিজের ছেলে, বোনজামাই এবং আপন ভাগ্নের স্ত্রী ডিলারশিপ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে সত্যতা পাওয়া গেছে।
এমপির স্বজনদের দখলে সারের বাজার
অনুসন্ধানে জানা যায়, নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়ন থেকে সংসদ সদস্য আবদুল হান্নানের ছেলে আদনান সাদী ‘মেসার্স আলীয়াহ ট্রেডার্স’-এর নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন। নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন থেকে এমপির বোনজামাই আরক মিয়ার ঝুলিতে গেছে ‘মেসার্স আয়ান ট্রেডার্স’।
এছাড়া গোয়ালনগর ইউনিয়ন থেকে ডিলারশিপ পেয়েছে ‘এস এস ট্রেডার্স’, যার স্বত্বাধিকারী নুরুন্নাহার আক্তার স্বর্ণা। তিনি এমপির আপন ভাগ্নে শরীফের স্ত্রী এবং একই সঙ্গে নাসিরনগর সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক মিয়ার মেয়ে।
স্থানীয় প্রশাসন এমপির ছেলে ও স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রশাসনের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এমপির পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের নাম তালিকায় আসার বিষয়টি শতভাগ সত্য।
এ বিষয়ে জানতে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান এবং তাঁর ছেলে আদনান সাদীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।
তবে এমপির বোনজামাই আরক মিয়ার ছেলে, তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসেন ডিলারশিপ পাওয়ার তথ্য স্বীকার করে বলেন, ‘আমার বাবা দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন। আমি সবসময় এমপির সঙ্গে থাকি। এখন কাজ না করলে কখন করব?’ পরিবারের অন্য স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করেন।
শুধু নাসিরনগরই নয়, সারের ডিলারশিপ বণ্টন ঘিরে বিতর্ক ছড়িয়েছে অন্য উপজেলাগুলোতেও। সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে ২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার এক মামলার আসামি ও যুবলীগ নেতা বিল্লাল মিয়াকে ডিলার দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে নবীনগর উপজেলার বড়াইল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল বাশারের ছেলে রুবেল পেয়েছেন ‘রুবেল এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে ডিলারশিপ। ফলে ত্যাগী ব্যবসায়ী ও প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
বাণিজ্য ও তদারকি কমিটির বক্তব্য
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১০১টি ইউনিয়ন ও ৫টি পৌরসভায় মোট ১০৬টি ডিলারশিপের বিপরীতে ৮২৫ জন ব্যবসায়ী আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রতি ইউনিয়নের জন্য ৩ জন করে মোট ২৯২ জনের নাম কেন্দ্রীয় কমিটিতে সুপারিশ করে পাঠায়।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা থেকে জেলা কমিটিতে সুপারিশ পাঠানোর সময় তালিকার ১ নম্বরে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে ডিলারপ্রতি মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে।
তবে টাকা লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান বলেন, ‘উপজেলা কমিটি থেকে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য যেসব নাম পাঠানো হয়েছিল, আমরা হুবহু সেগুলোই মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। দুই-একটি নাম হয়তো পরিবর্তন হতে পারে। লেনদেনের বিষয়ে আমার জানা নেই, তবে স্থানীয় কোনো প্রভাব থেকে থাকলে তা উপজেলা পর্যায়ে হতে পারে।’
ডিলার তালিকা প্রকাশের পর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ার বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করেন।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১২ অক্টোবর ২০২৬