বাংলাদেশে সারে দেওয়া মোট ভর্তুকির প্রায় অর্ধেকই চলে যাচ্ছে দেশের বড় বড় কৃষকদের পকেটে। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ নামক সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে, যা দেশের কৃষি খাতের বিতরণ ব্যবস্থার বৈষম্য ও নীতিগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।

বড় কৃষকদের কব্জায় অর্ধেকের বেশি সুবিধা
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সারে ভর্তুকির মতো ব্যয়বহুল কর্মসূচির সুফল মূলত ভোগ করছেন বৃহদাকার খামারিরা, যাঁদের দখলে রয়েছে দেশের মোট কৃষিজমির প্রায় ২০ শতাংশ। এর বিপরীতে, দেশের ৪০ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক পাচ্ছেন মোট ভর্তুকির মাত্র ১৩ শতাংশ। 

অথচ দেশের ৯২ শতাংশ খামারের জমিতোই আড়াই একরের কম। এমনকি প্রতি ১০ জন খামারির ৪ জনের জমিতো আধা একরের চেয়েও কম, যা দেশের মোট কৃষিজমির মাত্র ১১ শতাংশ।

আয়ের ক্রমানুসারে দেখলে, সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ কৃষক সরকারের প্রত্যক্ষ সুবিধার তিন ভাগের এক ভাগের কিছু কম পেয়ে থাকে, আর ২০ শতাংশ ধনী কৃষক প্রায় অর্ধেক সুবিধা ভোগ করে। খাদ্যমূল্য ও কৃষি মজুরির মাধ্যমে আসা অপ্রত্যক্ষ সুবিধাও মূলত সচ্ছল কৃষকদের পক্ষেই যায়।

ভর্তুকির উল্লম্ফন ও অর্থনীতির ওপর চাপ
গত পাঁচ বছরে দেশে সারে ভর্তুকি প্রায় চার গুণ বেড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২০২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছর পর্যন্ত সরকার কৃষি ভর্তুকিতে ১ লাখ ২ হাজার ২৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা আগের পাঁচ বছরের মোট ব্যয়ের তিন গুণেরও বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকি যৌক্তিক করার তাগিদ দিয়ে আসছে।

মাঠে সার ছিটাচ্ছেন কৃষক
বাংলাদেশের কৃষকরা বছরে প্রায় ৬৬ লাখ টন সার ব্যবহার করেন, যার ৮৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। গ্যাস সংকট, কারখানার কার্যকারিতা ও পরিচালনগত বাধার কারণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ভর্তুকির ওপর চাপ আরও বাড়ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মতো বৈশ্বিক অস্থিরতায় এই ঝুঁকিগুলো আরও ঘনীভূত হয়েছে।

গবেষণায় অবহেলা ও বাজেট বৈষম্য
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের ৬৩ শতাংশ ভর্তুকিতে গেলেও ২০২২-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য ও কৃষিখাতের মোট ব্যয়ের ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ ভর্তুকিতে ব্যয় হলেও কৃষি গবেষণা পেয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ। 

অর্থাৎ, গবেষণায় বরাদ্দ করা প্রতি ১ টাকার বিপরীতে ভর্তুকিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ টাকা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, ভর্তুকির পাশাপাশি সার যেন সঠিক সময়ে ও সঠিক মূল্যে প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

ডিলারদের সিন্ডিকেট ও বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ
দুর্বল তদারকি ও ডিলারদের কারসাজির কারণে কালোবাজারি এবং অতিরিক্ত দাম আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়, যার ফলে কৃষকদের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ গুণতে হয়। এই সংকট নিরসনে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। 

একইসঙ্গে, বিএনপি সরকারের আমলে চালু করা 'কৃষক কার্ড'-এর আদলে ইলেকট্রনিক ভাউচার ও ডিজিটাল নিবন্ধনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি সহায়তার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বর্গাচাষিসহ প্রকৃত চাষিরা উপকৃত হতে পারবেন।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১৪ অক্টোবর ২০২৬