উড়োজাহাজ থেকে নেমে দেশে ফেরার স্বস্তি মিলছে না অনেক যাত্রীর। ইমিগ্রেশন পেরিয়ে লাগেজের অপেক্ষা, তারপর ট্রলি খুঁজে বেড়ানো—হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভোগান্তির এই চক্র চলছে। একসঙ্গে দুই-তিনটি ফ্লাইট নামলে লাগেজ সংগ্রহ করে বের হতে দুই থেকে তিন ঘণ্টাও লাগে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
অথচ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর বাড়াতে একের পর এক ক্রয়চুক্তি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতের আকাশযাত্রা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বর্তমান যাত্রীর ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করার অগ্রাধিকার কোথায়?
চীন থেকে দেশে ফিরে অন্য এক যাত্রীর সঙ্গে কাস্টমসের আচরণে আপত্তি জানিয়েছিলেন ব্যবসায়ী নাঈমুল ইসলাম। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তার অভিযোগ, এরপর তাকে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়। জরিমানা করা হয় ৩৬ হাজার টাকা।
জরিমানার টাকা জমা দিলেও আটকে রাখা লাগেজ ও মালামাল ফেরত পাননি। তার ভাষায়, ‘আজ পর্যন্ত আমার মালামালসহ লাগেজটি ফেরত পাইনি।’ বিমানবন্দরে যাত্রীর অসহায়ত্বের এমন অভিযোগ ট্রলির সংকটের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। লাগেজ হারানো, কেটে মালামাল চুরির অভিযোগ, অযত্নে ব্যাগ ভাঙা, দীর্ঘ অপেক্ষা, ওজন নিয়ে বিরোধ এবং তল্লাশি ও ইমিগ্রেশনে হয়রানি—শাহজালালের যাত্রীসেবা নিয়ে প্রশ্ন বহু ধাপে।
বিমানবন্দরের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত হটলাইন ও ওয়েবসাইটে ২০ হাজারের বেশি অভিযোগ ও জিজ্ঞাসা আসে। প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডসংক্রান্ত। কর্তৃপক্ষের দাবি, মোট অভিযোগ ও জিজ্ঞাসার ৯৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে। এই হিসাবে সাধারণ জিজ্ঞাসাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুরির ঘটনায় শাস্তির নজিরও রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে অন্য যাত্রীদের লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দর ছাড়ার ঘটনায় আরমান হোসেনকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। কর্তৃপক্ষ জানায়, অভিযোগের ভিত্তিতে গোয়েন্দা নজরদারি ও সিসিটিভি বিশ্লেষণে তার অপরাধ শনাক্ত হয়। অন্যদিকে গত জুনে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির একটি বহুল প্রচারিত দাবি তদন্তে নাকচ করে বিমান ও মন্ত্রণালয়। তাদের বক্তব্য, ঢাকায় চুরি বা লাগেজ কাটার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
লাগেজ ভাঙার বিষয়ে সাংবাদিক নাঈম আবির বলেছেন, ‘ঢাকা বিমানবন্দরে লাগেজ ভাঙার ঘটনা অহরহ ঘটছে।’ তার মতে, কর্মীরা যত্ন করে রাখার বদলে বেল্টে লাগেজ ছুড়ে দিলে ভঙ্গুর ব্যাগ ভেঙে যায়। তার মতে, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতার অভাব ও কর্মীদের জবাবদিহির দুর্বলতা এর পেছনে রয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্ব পালনে গাফিলতিকে ভোগান্তির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে এয়ারলাইনস অপারেটরস কমিটির এক কর্মকর্তার অভিযোগ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য ফি দিয়েও প্রয়োজনীয় হাইলোডার পাওয়া যায় না; ফলে লাগেজ খালাস ও ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হয়। এতে যাত্রীদের পাশাপাশি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর সেবাপ্রাপ্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
যাত্রীদের ক্ষোভের ভিডিও বারবার সামনে আসে। ২০২৫ সালের জুনে তুহিন আলী নামে এক যাত্রীর লাগেজ ছুড়ে ফেলা ও লাথি মারার দৃশ্য ভাইরাল হয়। ওই ঘটনার কারণ নিয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিল; চুরির কারণে তিনি এমন করেছেন, তা নিশ্চিত হয়নি। বেবিচকের বক্তব্য, ওই যাত্রী এয়ারলাইনস প্রতিনিধিদের সহযোগিতা করেননি।

ওমরাফেরত দন্তচিকিৎসক ওরাকাতুল জান্নাতও ১ অক্টোবরের ভোগান্তি তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, সকাল পৌনে ৯টায় নামার পর লাগেজ পেতে প্রায় সাড়ে ১১টা বেজে যায়। বয়স্ক যাত্রী ও শিশুদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও ছিল না। দীর্ঘ অপেক্ষায় প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
গত ১ অক্টোবর মদিনাফেরত বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটের লাগেজ ও জমজমের পানি পেতে বিলম্বের ঘটনায় চার সংসদ সদস্য লিখিত অভিযোগ করেন। নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে জামায়াতের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামানের বাগবিতণ্ডার পর তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ঘটনাটিকে ‘মব ও ইচ্ছাকৃত বিশৃঙ্খলা’ বলেছেন। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের দাবি, যাত্রী হয়রানির প্রতিবাদ করায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার বিচার এবং সেবার ব্যর্থতা—দুটিরই জবাবদিহি প্রয়োজন।
লাগেজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। ৫ অক্টোবর আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন আইনি নোটিশে উড়োজাহাজ থেকে বেল্ট পর্যন্ত লাগেজ পরিবহনের দৃশ্য যাত্রীদের সামনে সরাসরি সম্প্রচারের দাবি জানান। তল্লাশিতেও স্বচ্ছতা চান তিনি।
একই দিন বিমানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে লাগেজ চুরি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন না। পুরোনো ভিডিও দিয়ে অপপ্রচার হচ্ছে বলেও তার অভিযোগ। এসব বক্তব্যের পাশে অভিযোগভিত্তিক তদন্তের ফল প্রকাশ করলে পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।
এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের হটলাইন ও অভিযোগ অনুসরণের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। মন্ত্রী দ্রুত ট্রলি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। বিমানের গ্রাহকসেবা পরিচালক বদরুল হাসান লিটন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় প্রাথমিকভাবে গাফিলতি পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল আংশিক চালুর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে সরকার। সেখানে দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগ এবং নির্দিষ্ট সূচকে সেবার মান পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমান টার্মিনালের যাত্রীদের সমস্যা মেটাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
যাত্রী সেবার মান উন্নত করার কোনো অগ্রগতি না থাকলেও এর মধ্যেই বহর বাড়াতে বড় চুক্তি হচ্ছে। এপ্রিলের ১৪টির পর সেপ্টেম্বরে আরও ১১টি মিলিয়ে এ বছর ২৫টি বোয়িংয়ের ক্রয়াদেশ দিয়েছে বিমান। নতুন ১১টির দাম প্রায় ২৭০ কোটি মার্কিন ডলার বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। বুধবার (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ১০টি এয়ারবাস কেনার চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠান নির্ধারিত রয়েছে।
আগের বোয়িং চুক্তির প্রথম উড়োজাহাজ আসার কথা ২০৩১ সালে। সরকারের যুক্তি, সরবরাহ পেতে বহু বছর লাগে; ভবিষ্যৎ চাহিদার জন্য আগেই ক্রয়াদেশ দিতে হচ্ছে। তবে উড়োজাহাজের বহর বাড়ানোর সঙ্গে যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।
বিমান ও বেবিচকের দায়িত্ব এবং অর্থায়ন আলাদা; উড়োজাহাজ কেনার কারণে ট্রলি বা লাগেজসেবার অর্থ আটকে গেছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রশ্নটি প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের। ব্যাগ কোথায় হারাল, কীভাবে ভাঙল, কে তল্লাশি করল, অভিযোগের কী ফল হলো—এসবের নির্ভরযোগ্য উত্তর চান যাত্রীরা। বড় বিনিয়োগের সুফল তাদের কাছে পৌঁছাবে তখনই, যখন দেশে ফিরে অক্ষত মালামাল হাতে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বিমানবন্দর ছাড়তে পারবেন।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬