বিটিআরসিতে বদলি-আতঙ্ক

  • পদ ও অবকাঠামো ছাড়াই বদলি: অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নেমেই হয়রানির শিকার বিটিআরসি কর্মকর্তারা
  • রিট করায় দুই কর্মকর্তাকে স্টেশন মনিটরিংয়ে স্ট্যান্ড রিলিজ, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপপ্রয়োগের অভিযোগ

➤ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) নিয়োগ ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করায় দুই কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক হিসেবে ঢাকার বাইরে বদলি করার অভিযোগ উঠেছে। 

পদ, জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে তাদের রংপুর ও সিলেট মনিটরিং স্টেশনে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় বিটিআরসি এবং টেলিযোগাযোগ খাতের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বদলি-আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

সদ্য বদলির আদেশপ্রাপ্ত এই দুই কর্মকর্তা হলেন উপপরিচালক মো. জাকির হোসেন খাঁন ও আসিফ ওয়াহিদ। বিটিআরসির মানবসম্পদ শাখার এক আদেশে তাদের অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগ থেকে স্পেকট্রাম বিভাগে নিয়ে আসা হয়। 

এরপর গত ১৯ অক্টোবর স্পেকট্রাম বিভাগের পরিচালক সরকারি বিধির বাইরে গিয়ে তড়িঘড়ি করে তাদের রংপুর ও সিলেট মনিটরিং স্টেশনে স্ট্যান্ড রিলিজ দেন, যদিও এই ধরনের প্রশাসনিক কাজ মূলত প্রশাসন বিভাগের আওতাভুক্ত।

বদলি আদেশের ত্রুটি ও অবকাঠামোগত শূন্যতা 

গত ১৯ অক্টোবর ওই দুই কর্মকর্তা বিটিআরসি চেয়ারম্যানের কাছে বদলি আদেশের স্পষ্টীকরণ চেয়ে একটি আবেদন করেন। এতে তারা উল্লেখ করেন, বিটিআরসির বিদ্যমান প্রবিধানমালা ও সাংগঠনিক কাঠামোতে মনিটরিং স্টেশনগুলোর জন্য উপপরিচালক পর্যায়ের (৫ম গ্রেড) কোনো পদ সৃজন করা হয়নি। তা ছাড়া, স্পেকট্রাম বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনার জন্যও সাধারণ উপপরিচালকের কোনো পদ সেখানে নেই।

রংপুর ও সিলেট মনিটরিং স্টেশনে ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বসার মতো অফিস কক্ষ বা আনুষঙ্গিক কোনো সুবিধাই নেই। এমনকি ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, আইটি সরঞ্জাম এবং কার্যপরিধি নিয়েও বদলির আদেশে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তারা আদেশের ত্রুটি সংশোধনের দাবি জানালেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ‘আগে যোগদান, পরে দাবি নিষ্পত্তি’ নীতিতে অনড় রয়েছে।

বিটিআরসি
রিট করার কারণেই আক্রোশ? 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিটিআরসিতে ১/১১ এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শুরুর দিকের অবৈধ ও বিতর্কিত জুনিয়র পরামর্শক নিয়োগসহ নানা প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ওই দুই কর্মকর্তাসহ মোট ছয়জন উচ্চ আদালতে রিট করেন। এর পরপরই তাদের ওএসডি করে রাখা, কোনো কাজ না দেওয়া, অফিস কক্ষ সিলগালা করা এবং বারবার বদলির মতো হয়রানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, আইনি প্রতিকার চাওয়ার কারণে এমন শাস্তিমূলক বদলি প্রশাসনে ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করবে। এর আগেও মার্চ মাসে রিট করার জেরে তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল, পরে আদালতের হস্তক্ষেপে তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়।

মনিটরিং স্টেশনগুলোর বৈধতা ও বেহাল দশা 

২০০৭ সালে একটি প্রকল্পের আওতায় ঢাকাসহ দেশের ছয়টি স্থানে (রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, সিলেট ও চট্টগ্রাম) স্পেকট্রাম মনিটরিং স্টেশন স্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত এসব স্টেশন সরকারিভাবে অনুমোদিত নয় এবং এগুলো থেকে কমিশনের কোনো দৃশ্যমান অর্জন নেই। 

ভাড়া করা এসব স্থাপনায় আনসার, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে। ভবনগুলোর ভৌত অবস্থাও চরম ঝুঁকিপূর্ণ। গত বছর বগুড়া স্টেশনে ছাদের পলেস্তারা ধসে শাহজাহান আলি নামে বিটিআরসির এক উপসহকারী পরিচালকের মাথা ফেটে যায় এবং তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় আনতে হয়।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপপ্রয়োগ 

গত ৮ জুলাই তরঙ্গ পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলোকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর প্রস্তাব ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠান বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক। ১৯ আগস্ট মন্ত্রণালয় এতে সম্মতি দিলেও শর্ত জুড়ে দেয় যে, নতুন জনবল নিয়োগ বা অতিরিক্ত ব্যয় করা যাবে না এবং সেবাগুলো অনলাইনে দিতে হবে।

এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (টেলিকম) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘বিটিআরসির চিঠিতে মনিটরিং স্টেশনে কর্মকর্তা পাঠানো বা তাদের গ্রেড নিয়ে কোনো প্রস্তাব ছিল না। আমরা মূলত অনলাইনে তিনটি নতুন সেবা সম্প্রসারণের অনুমতি দিয়েছি। কারণ এসব তথ্যের জন্য মানুষকে সরাসরি অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এর বাইরে কর্মকর্তা পদায়ন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।’

চেয়ারম্যানের বক্তব্য সার্বিক বিষয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, ‘ঢাকার বাইরে বিটিআরসির কার্যালয় স্থাপনে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। সাধারণ মানুষ যেন সেবা পান, সেজন্যই সরকারের অনুমোদন নিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ 

অবকাঠামো না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শুরুতেই বিশাল স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে, এমন কথা নেই। প্রথমে অফিসার গিয়ে কাজ শুরু করবেন, এরপর ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।’ ◉

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ ২৯ অক্টোবর ২০২৬