ঢাকা: চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে অতিরিক্ত ১ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের এক বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠে নেমেছে সরকার। কিন্তু প্রথম দুই মাসেই (জুলাই-আগস্ট) আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা।

বিশাল এই ঘাটতি মেটাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশজুড়ে যে বিশেষ কৌশল ও অভিযান শুরু করেছে, তাতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর যেমন অমানবিক চাপ তৈরি হয়েছে, তেমনি জোরজবরদস্তি ও হয়রানির আশঙ্কায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

ঘাটতির পাহাড় ও এনবিআরের মরিয়া কৌশল
সরকারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের অর্থ জোগাতে চলতি অর্থবছর এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে (গত অর্থবছরে যা ছিল ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা)। কিন্তু জুলাই ও আগস্ট মাসে ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।

রাজস্বের এই বেহাল দশায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নির্দেশে বিশেষ ছক কষেছে এনবিআর। এখন থেকে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট বড় শিল্প খাতকে 'টার্গেট' করে অভিযান চালানো হচ্ছে। 

সেপ্টেম্বরে তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল ওষুধ শিল্প; অক্টোবরেও একটি বড় খাতকে টার্গেট করা হলেও কৌশলগত কারণে তা গোপন রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগ যৌথভাবে মাঠে নেমেছে। ভ্যাট আদায় কমে যাওয়ায় ত্রৈমাসিক রিটার্ন জমার পদ্ধতি বাতিল করে পুনরায় মাসিক নিয়মে ফিরে গেছে এনবিআর।

রাজস্ব আদায়ে হিমশিম খাচ্ছে এনবিআর
ব্যবসায়ী মহলে আতঙ্ক ও ক্ষোভ
কাঠামোগত কোনো সংস্কার না করে কেবল আদায়ের লক্ষ্য বাড়িয়ে দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)-এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, "সংস্কার ছাড়া বিশাল লক্ষ্য দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে টাকা তোলার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।"

এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক ফজলুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "খোদ অর্থমন্ত্রী বলেছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দুই-তিন বছর লাগবে। অথচ সরকারের খরচ বেড়েই চলেছে।" তিনি করদাতাদের হয়রানি না করে কর ফাঁকিবাজদের আইনের আওতায় আনার তাগিদ দেন। বিজিএমইএ-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলও কর আদায়ে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করার আহ্বান জানান।

তথ্য গোপনের সংস্কৃতি
রাজস্বের এই নাজুক পরিস্থিতির মাঝেই এনবিআর তাদের নিয়মিত মাসিক রাজস্ব আদায়ের হিসাব প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছে। চেয়ারম্যান আহসান হাবিব ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তাকে গণমাধ্যমে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে।

বেড়েছে সরকারের খরচ ও ব্যাংক ঋণ
একদিকে রাজস্ব আদায় তলানিতে, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানি, সরকারি কর্মচারীদের দ্বিগুণ বেতন কাঠামো এবং একনেকে পাস হওয়া লাখো কোটি টাকার নতুন মেগাপ্রকল্পের কারণে সরকারের খরচ লাগামহীনভাবে বাড়ছে।
সরকারের ঋণ বাড়ছে, সামাল দিবে কীভাবে?
খরচ মেটাতে সরকার ব্যাপকভাবে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১ হাজার ১৭ কোটি টাকাসহ মোট ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। 

অথচ গত বছরের একই সময়ে সরকার কোনো ঋণ না নিয়ে উল্টো ৬ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল। পুরো বছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা ও ম্যাক্রো ইকোনমিক চিত্র
অর্থনীতিবিদরা শুধু চাপ প্রয়োগ করে রাজস্ব আদায়ের ঘোর বিরোধী। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "উচ্চ সুদের এই ব্যাংক ঋণ ভবিষ্যতে সরকারের দায় আরও বাড়াবে। চাপ সৃষ্টি করে নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়লে এবং অটোমেশন নিশ্চিত হলেই রাজস্ব বাড়বে।" 

নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম করের অপরিকল্পিত ছাড় ও কর ফাঁকি রোধ করে দ্রুত একটি আধুনিক কর কাঠামো তৈরির পরামর্শ দেন।

সামগ্রিক অর্থনীতির চিত্রও গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বিনিয়োগ সংকট ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতায় প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে, মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে এবং চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামতে পারে (যা ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭.১ শতাংশ ছিল)। সংস্থাটি সরকারকে দ্রুত রাজস্ব বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার কড়া পরামর্শ দিয়েছে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ জেডআরসি/ ২৫ অক্টোবর ২০২৬