মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটকের ধারা বজায় রাখছে নতুন সরকার—এমন অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। 

সংস্থাটির মূল্যায়ন, অতীতে দমন-পীড়নের শিকার বিএনপি ক্ষমতায় এসে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও একই পথ অনুসরণ করছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, পুলিশ রাজনৈতিক অভিযোগ কতটা যাচাই করে অভিযানের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আইনি শর্ত ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত করছে।

ঢাকার জাসদ কার্যালয়ে যুবদল নেতাকর্মীদের অবস্থানের পর পুলিশি অভিযান এবং পরে ২৭ জনকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনায় দুটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। অভিযানের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক অভিযোগের ভূমিকা কতটা ছিল? আর আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন তথ্য গ্রেপ্তারের আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে? সরকারের গোয়েন্দা তথ্যের দাবি, জাসদের প্রতিবাদ এবং আদালতসংক্রান্ত প্রতিবেদনের মধ্যে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হচ্ছে।

২৬ সেপ্টেম্বর গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিনিধি সভা চলছিল বলে দলটি জানিয়েছে। যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়ন সেখানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গোপন বৈঠকের অভিযোগ তোলেন। জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনের দাবি, বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে ঢুকে সভায় হামলা চালান। আওয়ামী লীগের বৈঠকের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

পুলিশের ব্যাখ্যা ছিল আলাদা। ডিএমপির কর্মকর্তারা বলেন, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের সেখানে জড়ো হওয়ার তথ্য ছিল। নাশকতা বা অন্য অসৎ উদ্দেশ্যের সন্দেহে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজন পুলিশকে সহায়তা করেছেন বলেও জানানো হয়। ফলে ঘটনাটি দলীয় কর্মীদের অভিযোগের পাশাপাশি পুলিশের নিজস্ব তথ্যের দাবিকেও যাচাইয়ের সামনে এনেছে।

জাসদ কার্যালয়ে পুলিশ
পুলিশ প্রথমে প্রায় ৩০০ জনকে হেফাজতে নেওয়ার কথা জানায়। পরদিন দুপুরে ডিএমপির সহকারী কমিশনার সাকিবুল আলম ভূঁইয়া বলেন, আটক ২৭৮ জনের মধ্যে ২৪৯ জনকে পরিচয় যাচাই করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তখন আরও ২৯ জনের পরিচয় যাচাই চলছিল। এই পর্যায়ের সংখ্যা এবং পরে আদালতে পাঠানো ২৭ জনের সংখ্যা আলাদা সময়ের হিসাব।

বহু মানুষকে একসঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পর পরিচয় যাচাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আটকের আগে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কী তথ্য ছিল। দলীয় পরিচয় যাচাই এবং অপরাধে সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কারা সভার আয়োজক, কারা অংশগ্রহণকারী এবং কার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অপরাধের সন্দেহ ছিল, তা পৃথকভাবে দেখানো হলে অভিযানের প্রয়োজনীয়তা বোঝা সহজ হবে।

২৭ সেপ্টেম্বর আদালত ২৭ জনকে কারাগারে পাঠান। পরদিন তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশের আবেদনে স্লোগান দিয়ে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়ার কথাও বলা হয়। আবেদনটির ভাষ্য অনুযায়ী, তারা কোনো ধর্তব্য অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন বলে প্রাথমিক ধারণা করা হয়েছিল।

অন্য এক প্রতিবেদনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের পাশাপাশি ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও এসেছে। অভিযোগের এই বিবরণ থেকে কোন ব্যক্তির কী আচরণ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, তা স্পষ্ট করা জরুরি। শুধু সভায় উপস্থিতি, স্লোগান এবং নির্দিষ্ট অপরাধের মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে দেখানো হয়েছে, সেটিই গ্রেপ্তারের ভিত্তি যাচাইয়ের কেন্দ্রীয় বিষয়।

ফৌজদারি কার্যবিধির বর্তমান ৫৪ ধারা পুলিশকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেয়। সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডযোগ্য ধর্তব্য অপরাধের সন্দেহে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত অভিযোগ, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বা যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকতে হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ব্যক্তিটি অপরাধ করেছেন বলে বিশ্বাসের কারণ এবং তাকে গ্রেপ্তার করার প্রয়োজনও থাকতে হয়।
জাসদ নেতাদের আটক করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
এই ধরনের গ্রেপ্তারের প্রয়োজন হতে পারে তদন্তের স্বার্থে, নতুন অপরাধ ঠেকাতে, প্রমাণ নষ্ট হওয়া রোধে কিংবা আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কারণ লিখিতভাবে রাখার শর্ত রয়েছে। পাশাপাশি ৫৪এ ধারায় পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারণ জানানোর বিধান আছে।

সরকারের বক্তব্যে অবশ্য নাশকতার পরিকল্পনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ২৭ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাজনৈতিক অফিসে আলাপ-আলোচনা করতে অনুমতি লাগে না।’ তবে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের কিছু লোকজনের জড়ো হয়ে নাশকতার পরিকল্পনার তথ্য ছিল বলে তিনি দাবি করেন। কাউকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে অভিযান হয়নি বলেও জানান।

মন্ত্রী আরও জানান, আটক ২৭ জনের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। নাশকতায় সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা হবে। তার এই বক্তব্য তদন্তের পরবর্তী ধাপের কথা জানায়। তবে গ্রেপ্তারের সময়কার তথ্য এবং পরবর্তী পরীক্ষায় পাওয়া সম্ভাব্য তথ্যের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্তেরও নিজস্ব আইনি শর্ত রয়েছে।

৫ অক্টোবর প্রকাশিত লেখায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন ঘটনাটিকে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর আক্রমণের সর্বশেষ উদাহরণ বলেন। তার অভিযোগ, যুবদলের দাবির পর জাসদের প্রায় ২৯০ সমর্থককে আটক করা হয়। বিএনপি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটকের ধারা বজায় রেখেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পিয়ারসনের বক্তব্যে আরও এসেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সবার মতপ্রকাশ ও সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে এসব অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বর্তমান সরকারের একই ধরনের আচরণকে বৈধতা দিতে পারে না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও এই অধিকার বজায় রাখার এবং কার্যকর আইনি সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের ওপর রয়েছে।

এইচআরডব্লিউর মূল্যায়ন এবং সরকারের নিরাপত্তাজনিত ব্যাখ্যার মধ্যে ফারাক মেটাতে তাই অভিযানের অনুমোদন, গোয়েন্দা তথ্যের প্রকৃতি, গ্রেপ্তারের লিখিত কারণ ও প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ণাঙ্গ নথি ছাড়া নির্দিষ্ট গ্রেপ্তারের বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। তবে রাজনৈতিক অভিযোগ থেকে পুলিশি সিদ্ধান্ত পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করা নাগরিক অধিকার এবং আইন প্রয়োগে আস্থা রক্ষার জন্য প্রয়োজন।

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬