তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে। এ ঘটনায় আটক তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, ঘটনার রাতে ‘পুলিশের লোক’ তাদের ধাওয়া দিলে আত্মরক্ষার্থে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তিনি নিজে পালিয়ে রক্ষা পান।

এদিকে, মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছে পিবিআই।

চাঞ্চল্যকর এই মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে ছায়াতদন্ত করছে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর। এর অংশ হিসেবে উদ্ধার হওয়া নম্বরবিহীন মোটরসাইকেলটি রাজধানী ঢাকার উত্তরখান থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

মরদেহের ৫০ গজ দূরে মিলল নম্বরবিহীন বাইক
পিবিআই সদর দপ্তরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ জানান, টঙ্গীর মাজার বস্তি সংলগ্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি নিহত তাহসিফের কি না, তা কারিগরি ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে এটি তাহসিফের ব্যবহৃত বাহন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। নিখোঁজ হওয়ার আগে সংগৃহীত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছিল, তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিতে কোনো নম্বরপ্লেট ছিল না; উদ্ধারকৃত বাইকটিও সম্পূর্ণ নম্বরপ্লেটবিহীন।

মাদক স্পটের ধাওয়া নাকি ‘পুলিশের লোক’—ধোঁয়াশা তদন্তে
তদন্তসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের সূত্রমতে, তুরাগ নদের যে রাজবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি মূলত চিহ্নিত একটি মাদকপ্রবণ স্পট। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা ছিল, গভীর রাতে মাদক কারবারি কিংবা স্থানীয় কোনো অপরাধী চক্রের ধাওয়ার মুখে পড়ে প্রাণ বাঁচাতে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং সাঁতার না জানায় কিংবা তীব্র স্রোতের কারণে পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়।

তবে আটক আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিয়ে রাতভর বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত অভিযানের সময় তিনি দাবি করেন, সে রাতে তাদের ধাওয়াকারীরা সাধারণ অপরাধী ছিল না; তারা ছিল ‘পুলিশের লোক’।

দীপের এই বিস্ফোরক দাবি তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীপ নিজের দায় এড়াতে এমন গল্প সাজিয়েছেন, নাকি প্রকৃতপক্ষে সেখানে সাদা পোশাকে কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বা সোর্স উপস্থিত ছিলেন—তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সেই রাতে কী ঘটেছিল: সিসিটিভি ও শেষ বার্তা
পারিবারিক সূত্র ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় জানা যায়, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তরার নিজ বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন তাহসিফ। রাত গভীর হলে পরিবারের সদস্যরা তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মায়ের মুঠোফোনে একটি শেষ ভয়েস মেসেজ পাঠান তাহসিফ। সেখানে তিনি দ্রুত বাসায় ফিরে আসছেন বলে জানান। কিন্তু ওই বার্তার পর থেকেই তার ফোনটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

পরদিন বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজবাড়ী ঘাট এলাকায় এক যুবকের ভাসমান মরদেহ দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দিলে নৌ পুলিশ গিয়ে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে। এ সময় তার পরনের পোশাক, হাতঘড়ি এবং পকেটে থাকা জিনিসপত্র অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেলেও মোটরসাইকেলটির কোনো সন্ধান মেলেনি।

রহস্য উদঘাটনে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পিবিআই দেখতে পায়, নিখোঁজের আগে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের গ্যারেজের সামনে তাহসিফের ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ দীপের সাথে তার দেখা হয়। সেখানে দুজন হাত মেলান এবং পৃথক দুটি মোটরসাইকেলযোগে এলাকা ছাড়েন। এই তথ্যের ভিত্তিতেই বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই মেট্রো উত্তর।

পরিবারের দাবি: এটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড
গতকাল শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে তাহসিফের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং পরে উত্তরার কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

ছেলের মৃত্যুকে কোনোভাবেই দুর্ঘটনা বা অপমৃত্যু মানতে নারাজ বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। বুকভাঙা কান্নায় তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমার ছেলেকে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই আত্মহত্যা বা অসাবধানতাবশত নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়। নিখোঁজ হওয়ার সময় তার সাথে থাকা মোটরসাইকেল উধাও হয়েছিল, মোবাইল বন্ধ ছিল। সরকারের উচিত একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের মুখোশ উন্মোচন করা।’

নৌ পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের রাসায়নিক পরীক্ষা ও ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট হবে। একই সাথে আটক দীপকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সে রাতের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে তদন্ত জোরদার করা হয়েছে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ৩০ অক্টোবর ২০২৬