বাণিজ্যিক সফলতার আড়ালে নীতিগত প্রশ্ন
- প্রথম আলোর ‘স্যরি’ ক্যাম্পেইন: রহস্যময় মার্কেটিং কৌশল নাকি সম্পাদকীয় অসহায়ত্ব?
- দুই অক্ষরের শব্দে তোলপাড়: মতিউর রহমানের ‘স্যরি’ ঘিরে নেটমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
➤ দুই অক্ষরের একটি ছোট্ট শব্দ—‘স্যরি’। আর এই এক শব্দ দিয়েই দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র কৌতূহল, জল্পনা-কল্পনা এবং বিতর্কের ঝড় তুলেছে সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র প্রথম আলো। শুরুতে কেউ বুঝতে পারছিলেন না যে প্রথম আলো কেন ক্ষমা চাইছে।
অবশেষে ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সম্পাদক মতিউর রহমানের দেওয়া ব্যাখ্যার পর বিষয়টি পরিষ্কার হলেও আলোচনা থামেনি। বরং, গণমাধ্যমের নীতিগত অবস্থান বনাম ব্যবসায়িক মার্কেটিং কৌশল—এ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন এক বিতর্ক।
রহস্যের শুরু ও নেটদুনিয়ার প্রতিক্রিয়া
ঘটনার সূত্রপাত ৩ নভেম্বর (২০২৬) বিকেলে। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে হঠাৎ একটি সাদামাটা ফটোকার্ড শেয়ার করা হয়, যাতে লেখা ছিল কেবল ‘স্যরি’। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রথম আলোর অন্যান্য কর্মীদের ওয়ালেও কার্ডটি ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই নেটিজেনদের মনে প্রশ্ন জাগে—প্রথম আলো কি এমন কোনো বড় ভুল করেছে যে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে?
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর এ নিয়ে তার ফেসবুকে সম্ভাব্য কারণগুলো বিশ্লেষণ করেন। তিনি মজা করে ‘ভুল করে সত্য ছাপিয়ে ফেলা’ বা ‘গোল্লাছুট ও সুডোকুর হিসাব মেলানোর’ কথা বললেও, গভীরে গিয়ে সরকারি চাপ বা বিচারহীনতার প্রেক্ষাপটও সামনে আনেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন—এটি কি প্রথম আলোর টিকে থাকার কোনো কৌশল, নাকি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চরম অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ?
মতিউর রহমানের ‘ব্যাবজ্যোক্তি’ বা ব্যঙ্গাত্মক ব্যাখ্যা
৪ নভেম্বর প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত এক লেখায় ‘স্যরি’র রহস্য উন্মোচন করেন মতিউর রহমান। তিনি শব্দটিকে আক্ষরিক অর্থে ক্ষমা প্রার্থনা হিসেবে নয়, বরং ‘ব্যাবজ্যোক্তি’ বা ব্যঙ্গাত্মক অর্থে ব্যবহার করেছেন বলে জানান।
তিনি লেখেন, "স্যরি, সবাইকে খুশি করতে পারিনি। (আসলে সবাইকে খুশি করতে চাই না। সেটা আমাদের কাজই নয়।) স্যরি, সব বিষয়ে সহমত হতে পারিনি। (ভিন্নমতই সমাজের চালিকাশক্তি।) স্যরি, অনিয়মে চুপ থাকতে পারিনি।"
এই ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গির পাশাপাশি তিনি ‘সিরিয়াস স্যরি’র কথাও উল্লেখ করেন। দীর্ঘ ২৮ বছরের পথচলায় অনিচ্ছাকৃত যেসব ভুল হয়েছে এবং যেগুলো তারা উপলব্ধি করার পর সংশোধন করেছেন, তার জন্য পাঠকদের কাছে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। তবে সুনির্দিষ্টভাবে কী কী ভুল তারা করেছেন, তা তিনি সযত্নে এড়িয়ে যান।

প্রথম আলো ও মতিউর রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির টানাপোড়েন সর্বজনবিদিত। বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের সময় মাইনাস টু ফর্মুলার পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়ার ইতিহাস নতুন নয়।
তবে মতিউর রহমান তার লেখায় সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর কথা এবং ছাত্রজীবনে রাজনীতি করার কথা উল্লেখ করলেও, তিনি যে একসময় কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মুখপত্র ‘একতা’র সম্পাদক ছিলেন এবং সিপিবির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—তা এড়িয়ে গেছেন।
প্রথম আলোর এই ব্যঙ্গাত্মক ব্যাখ্যার সঙ্গে অনেকেই একমত হতে পারেননি। সাংবাদিক ও টিভি আলোচক আশরাফ কায়সার স্পষ্ট লিখেছেন, "অপকর্মের জন্য স্যরি বলুন।"
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আবদুর নূর তুষার বিষয়টি আরও নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে বলেন, "যাকে খুশি করতে চান নাই, সে যদি খুশি না হয়, সেটাই তো করতে চেয়েছিলেন। তাহলে তাকে স্যরি বলতে হবে কেন? তার মানে যারা দুষ্ট লোক বা দুর্নীতিবাজ, প্রথম আলো প্রকারান্তরে তাদের কাছেই স্যরি কার্ড পাঠাচ্ছে!"
মার্কেটিংয়ের চমক নাকি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল?
সম্পাদকের নীতিগত ব্যাখ্যার বাইরে এই ক্যাম্পেইনটিকে অনেকেই একটি চরম সফল ‘মার্কেটিং কৌশল’ হিসেবে দেখছেন। ৩ নভেম্বর রাতে চ্যানেল আইয়ের ‘তৃতীয় মাত্রা’ অনুষ্ঠানে মতিউর রহমান নিজেই জানিয়েছেন, সন্ধ্যা ৬টায় পোস্ট করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, যা প্রথম আলোর ইতিহাসে সর্বোচ্চ এনগেজমেন্ট।
যদিও ২ লাখের বেশি রিঅ্যাকশনের মধ্যে ‘হা-হা’ রিঅ্যাক্ট যে সবচেয়ে বেশি ছিল, তা তিনি এড়িয়ে যান। প্রথম আলোর মনিটাইজড পেজ থেকে এমন ভাইরাল পোস্টে যে বড় অঙ্কের আর্থিক আয় হয়েছে, তা নিশ্চিত।
ক্যাম্পেইন সংশ্লিষ্ট একজন জানান, প্রথম আলোর ব্র্যান্ড প্রেফারেন্স কমে আসছিল এবং পাঠকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছিল বিভ্রান্তি। ব্র্যান্ডের অবস্থান স্পষ্ট করে প্রথম আলোকে மீண்டும் আলোচনায় ফিরিয়ে আনতেই এই সাদামাটা, টেক্সটনির্ভর কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক ক্যাম্পেইনটি সাজানো হয়।
তবে বিপরীত মতও রয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি সংবাদমাধ্যম কি কেবল অনলাইনে হাই এনগেজমেন্ট বা তোলপাড় তোলার জন্য এত বড় ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাম্পেইন করতে পারে? যেখানে বার্তাটি (মেসেজ কনসিস্টেন্সি) সবার কাছে একইভাবে পৌঁছায়নি এবং সেলিব্রিটিরাও বিভ্রান্ত হয়ে সেই ‘স্যরি’ কার্ড শেয়ার করেছেন।
প্রথম আলোর এই ‘স্যরি’ ক্যাম্পেইন হয়তো বাণিজ্যিক বা এনগেজমেন্টের দিক থেকে সফল, কিন্তু গণমাধ্যমের নৈতিক অবস্থান ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে এটি যে ভিন্নতর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে—তা আগামী দিনে গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের জন্য আলোচনার বড় খোরাক হয়ে থাকবে। ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০৬ নভেম্বর ২০২৬