অর্থনীতিবিদদের কঠোর হুঁশিয়ারি
➤ আইএমএফের প্রাক্কলনে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে মন্থরগতির অর্থনীতির শঙ্কা; কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসনের অভাবেই এই বিপর্যয়, মত বিশেষজ্ঞদের
➤ শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সাহসী পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশ নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত কর্মসংস্থানের এক দীর্ঘস্থায়ী ‘ফাঁদে’ আটকে পড়বে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)সহ বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক হতাশাজনক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস পর্যালোচনার পর এই মারাত্মক ঝুঁকির কথা জানান তারা।
আইএমএফের প্রাক্কলন: তলানিতে নামছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি
আইএমএফের সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ অনুযায়ী, ২০৩১ সাল নাগাদ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে মন্থরগতির অর্থনীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সংস্থাটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.২ শতাংশে নেমে আসবে।
আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা আরও কমে ২.২ শতাংশে ঠেকবে। পরবর্তীতে ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ ধীরগতিতে পুনরুদ্ধার হয়ে প্রবৃদ্ধি কেবল ৩ শতাংশের আশপাশে (প্রায় ২.৯৭ শতাংশ) পৌঁছাবে।
অথচ সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। 
১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ
প্রবৃদ্ধির এই ধসের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চিত্র আরও ভয়াবহ। আইএমএফ জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়াবে ১০.৯ শতাংশে—যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং ছয় মাস আগের পূর্বাভাসের প্রায় দ্বিগুণ। টানা চার বছর ধরে দেশে ৮ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি বিরাজ করায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন ও সুশাসনের সংকট
এই সংকটকে কেবল বৈশ্বিক বা বহিস্থ ধাক্কার পরিণতি হিসেবে দেখতে নারাজ দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। তারা কাঠামোগত ব্যর্থতা ও সুশাসনের অভাবকেই এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আইএমএফের পূর্বাভাসকে একটি ‘বেজলাইন সিনারিও’ বা ন্যূনতম চিত্র উল্লেখ করে বলেন, ব্যাংকিং, জ্বালানি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সংস্কারে ব্যর্থ হলে এই করুণ চিত্রই বাস্তব রূপ নেবে। বৈশ্বিক সংকটের দোহাই দিয়ে দেশের দীর্ঘদিনের সুশাসনের ব্যর্থতা ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতাকেও তিনি ‘অর্ধ-সত্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে এক জটিল ফাঁদে আটকা পড়েছে উল্লেখ করে পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অতীতে দারিদ্র্য নিরসনে অর্জিত সাফল্য এখন উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এই বিপজ্জনক ফাঁদ ভাঙতে সবার আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিকেন্দ্রীকরণ এবং দুর্নীতি বন্ধ করার তাগিদ দেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট, খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি খাতের তীব্র অদক্ষতা এবং দুর্বল রাজস্ব আদায় সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবিলম্বে কার্যকর সংস্কার ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদী এক গভীর অচলাবস্থার দিকে ধাবিত হবে। ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬