আগামী শিক্ষাবর্ষে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের বেশ কিছু বিষয় নতুন করে সংযোজন ও পরিমার্জন করা হচ্ছে। ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাশাপাশি স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলো যুক্ত করা হচ্ছে।  

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ‘সঠিক ইতিহাস’ তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কী থাকছে নতুন পাঠ্যবইয়ে?
এনসিটিবির একটি নথি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে বাংলা সাহিত্য, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বিষয়ে মোট ১৪টি সংযোজন ও সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন হলো:   

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জীবনী:
পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’ অংশে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী যুক্ত করা হবে।

‘উই রিভোল্ট’ ও স্বাধীনতার ঘোষণা:
তৃতীয় থেকে সপ্তম শ্রেণির বইয়ে জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভোল্ট’ বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্ষেপে এবং অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির বইয়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ প্রবন্ধটিও যুক্ত হবে।   

মুক্তিযুদ্ধের বিস্তারিত ইতিহাস:
ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ে সাত বীরশ্রেষ্ঠকে নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা থাকবে। অষ্টম শ্রেণির বইয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ ব্রিগেড ফোর্স’ এবং নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক প্রস্তুতি, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিলের তেলিয়াপাড়া বৈঠকের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে।   

শিশুদের হাতে নতুন বই...
৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও ৯০-এর অভ্যুত্থান:
ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পরবর্তী শ্রেণিগুলোর বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকবে। এছাড়া, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার অবদান নিয়েও লেখা থাকবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান:
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও পাঠ্যবইয়ে স্থান পাচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির বইয়ে ‘শহিদ আনাসের কথা’ এবং নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ নিয়ে লেখা থাকবে।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংসদকে জানিয়েছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণ, আন্দোলনকারীদের হত্যা, আত্মত্যাগ, নারীদের ভূমিকা এবং এই অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বয়স উপযোগীভাবে জাতীয় শিক্ষাক্রমে সংযোজন করা হবে। 

এছাড়াও, নবম ও দশম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুম, হত্যাকাণ্ড, অর্থ পাচার, নির্বাচনী ব্যবস্থা, পিলখানা ট্র্যাজেডি, সাংবাদিক হত্যা এবং গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।   

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতে ইতিহাস
তবে, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের এই রদবদল নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতেই ইতিহাসের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা উচিত। 

তিনি আরও বলেন, “আজ একটি দল ক্ষমতায় আসবে, কাল আরেকটি দল আসবে, আর তারা নিজেদের মতো করে ইতিহাস সাজাবে, এটা ইতিহাস হতে পারে না। যে-ই ক্ষমতায় আসুক, আমরা চাই নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা হোক”। 

তিনি নিরপেক্ষ ও যোগ্য বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ঐতিহাসিক বিষয়গুলো লেখানোর ওপর জোর দেন এবং বলেন, এর ভিত্তি হওয়া উচিত নথিভুক্ত তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য। 

বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের বই উৎসব পালন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
বই ছাপার কাজ কতদূর?
এনসিটিবি ২০২৭ সালের জন্য প্রাক-প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও সমমানের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর জন্য প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপার পরিকল্পনা করেছে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের জানান, প্রাথমিক স্তরের বই ছাপা ও সরবরাহের কাজ তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও মাধ্যমিক স্তরের কাজ পিছিয়ে আছে। 

প্রাক-প্রাথমিকের ৮৪ শতাংশ বই ছাপা ও সরবরাহ করা হলেও মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের মাত্র ১৩ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। তবে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায় বই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে এনসিটিবি।   

২০২৮ সালে আসছে বড় পরিবর্তন
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, ২০২৭ সালের পরিবর্তন মূলত বিদ্যমান বইয়ে কিছু বিষয় সংযোজন ও পরিমার্জনের মধ্যেই সীমিত থাকবে। তবে ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে এবং এনসিটিবির কোর কমিটি চলতি মাস থেকেই সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করবে। 

ইতিহাসের এই পালাবদল পাঠ্যবইয়ে কতটুকু বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬