নতুন শিক্ষাবর্ষের দুই মাস বাকি

➤ প্রিন্টিংয়ে স্থবিরতা আর কোটি টাকার সিন্ডিকেট: বিপাকে এনসিটিবির পাঠ্যবই প্রকাশনা 

➤ দাঁড়িপাল্লা ও নৌকার ছবি বিতর্ক ছাপিয়ে পাঠ্যবই নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট

➤ নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি মাত্র দুই মাস। অথচ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো ও বিতরণের কাজ নিয়ে এবারও তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। 

প্রাথমিক স্তরের ছাপার কাজ কিছুটা সন্তোষজনক হলেও মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশ। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে দরপত্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শত কোটি টাকা লোপাট এবং বইয়ের ছবি নিয়ে নানামুখী বিতর্ক।

ধীরগতির মুদ্রণ ও পিডিআই চিত্র

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই বোর্ডের (এনসিটিবি) তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ শেষের দিকে থাকলেও ইবতেদায়ি এবং মাধ্যমিক স্তরের ছাপা চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে।

  • প্রাক-প্রাথমিক: ৫৭.৩০ লাখ বইয়ের মধ্যে ৮৮.৪৮% পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে।
  • প্রাথমিক (প্রথম-পঞ্চম): ৭.৬০ কোটি বইয়ের মধ্যে পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ৭১.১৬%।
  • ইবতেদায়ি (প্রথম-পঞ্চম): ৪.১৬ কোটি বইয়ের মধ্যে পিডিআই হয়েছে মাত্র ৪৬.৯৭%।
  • মাধ্যমিক (ষষ্ঠ-দশম): ১৭.৯৫ কোটি বইয়ের মধ্যে পিডিআই হয়েছে মাত্র ২৮.৩২%।

মাধ্যমিকের কাজ পাওয়া ১১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ৩০টি এখনো ঠিকমতো কাজই শুরু করেনি। নিম্নমানের কাগজের ব্যবহারের কারণে এরই মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ফর্মা এবং প্রাথমিকের ৩,৩৩৪টি বই বাতিল করা হয়েছে। 

ছাপাখানায় কাজ করছেন শ্রমিক
মুদ্রণ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তদারকি প্রতিষ্ঠান ও প্রেস মালিকদের আঁতাতের কারণে বাস্তবে যতো বই পিডিআই দেখানো হচ্ছে, মাঠে ততো বই পৌঁছাচ্ছে না।

ছবি নিয়ে নতুন বিতর্ক ও সংশোধন জটিলতা

ছাপার ধীরগতির মধ্যেই নতুন শিক্ষাবর্ষের বইয়ে ব্যবহৃত ছবি নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে ‘দাঁড়িপাল্লার’ ছবি ব্যবহার করায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। 

শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায় থেকে বই ফিরিয়ে এনে পৃষ্ঠা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিটিবি, যার পেছনে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। ৩৮ লাখ কপির মধ্যে ইতিমধ্যে ২০ লাখ কপি বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হয়েছিল।

এই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বাংলা, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বইয়ে ‘নৌকার’ ছবি থাকা নিয়ে আরেকটি পক্ষ আপত্তি তুলেছে। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে মোট ৮২টি নৌকার ছবি রয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এগুলো নতুন নয়, বিগত বছরগুলোতেও এই ছবিগুলো ছিল এবং পাঠ্যসূচির প্রয়োজনেই এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এটিকে রাজনৈতিক ইস্যু বানানোর চেষ্টা করছে।

সিন্ডিকেট জালিয়াতি ও দুদক অভিযান

বই ছাপার প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই ছিল নানা অনিয়ম। প্রথম দফায় দরপত্রের তথ্য ফাঁস করে একটি শক্তিশালী চক্র একক দরদাতার মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেয় এবং প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতেই মাত্র একজন করে দরদাতা অংশ নেন।

ছাপাখানায় দিনরাত কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকেরা। ছবি: সংগৃহীত
পরবর্তীতে এনসিটিবি কঠোর হওয়ায় ৩৪টি লটে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে সর্বনিম্ন ৪ থেকে সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ কম দর প্রস্তাব করা হয়, যার ফলে সরকারের ৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়। 

এই সিন্ডিকেটের পেছনে মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওসারুজ্জামান রুবেল, দুলাল সরকার, এস এম মহসিনসহ প্রভাবশালী কিছু প্রেস মালিক এবং এনসিটির কিছু কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এনসিটিবি কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে নথিপত্র জব্দ করেছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও চ্যালেঞ্জ

মুদ্রণ শিল্প সমিতির উপদেষ্টা তোফায়েল খান বলেন, "বই ছাপায় স্বচ্ছতা না থাকলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যোগসাজশ করে এনসিটিবিকে ঠকানো হয়েছে। এছাড়া পিডিআইয়ের ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানো জরুরি।"

অন্যদিকে, এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা দাবি করেছেন, "যেসব ভুলত্রুটি হচ্ছে, তা সঙ্গে সঙ্গেই সংশোধন করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে এনসিটিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।"

অভিযোগ, অনিয়ম এবং নানা বিতর্কের ঘেরাটোপে থাকা পাঠ্যবই প্রকাশনার এই জটিলতা কাটিয়ে আগামী জানুয়ারি মাসে সব শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দেওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ◉

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ ২৬ অক্টোবর ২০২৬