দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত ঘটছে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। সম্প্রতি এলিফ্যান্ট রোডের কাঁটাবন, উত্তরা কিংবা কক্সবাজারের ইনানীতে ঘটা ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যেই সামনে এল আরও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান।
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) সারা দেশে ১৯ হাজার ৮৪৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ইতোমধ্যে ৪৫৩ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ।
বাড়তির দিকে বহুমাত্রিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবন প্রতিনিয়ত মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
বিগত ৫ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শুধু ২০২৫ সালেই সারা দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডে ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বেশি সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং ৮৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
এর আগের বছরগুলোতেও চিত্র ছিল প্রায় একই রকম—২০২৪ সালে ৪৪৬ কোটি এবং ২০২৩ সালে ৭৯২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে বাসাবাড়ি বা আবাসিক ভবনে। ২০২৫ সালে একা আবাসিক ভবনেই ২৬৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, বড় একটি অগ্নিকাণ্ডের পেছনে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে বৈদ্যুতিক গোলযোগ। অতীতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ৩৬ শতাংশই ঘটে শর্টসার্কিট থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অসচেতনতা এবং নিম্নমানের ইলেকট্রনিক সামগ্রীর অবাধ ব্যবহার এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শাহিদউল্লাহ বলেন, দেশের শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ-রাসায়নিকের ব্যবহার বাড়লেও সে অনুপাতে অগ্নিনিরাপত্তা বাড়েনি।
তার মতে, "কোথাও আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের পৌঁছাতে অন্তত ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে। এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ বা ভবন ব্যবহারকারীদের নিজস্ব সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি, যাতে তারা প্রাথমিক পর্যায়েই আগুনের তীব্রতা রুখে দিতে পারেন।"
রেসপন্স টাইম ও শুষ্ক মৌসুমের ঝুঁকি
আগুনে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার পেছনে ফায়ার সার্ভিসের দেরিতে পৌঁছানোর অভিযোগ প্রায়ই করেন ভুক্তভোগীরা। তবে এই অভিযোগের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স বিভাগের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান জানান, সংবাদ পাওয়ার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে স্টেশন থেকে বের হওয়ার নিয়ম তারা কঠোরভাবে পালন করেন। তবে আইনের প্রয়োগ এবং বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নে কাগজ-কলমের হিসাব আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই শুষ্ক মৌসুমে আগুনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তীব্র গরমে সামান্য স্পার্ক বা সিগারেটের উচ্ছিষ্ট থেকেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই কেবল শোক প্রকাশ বা ঝটিকা অভিযান নয়, বহুতল ভবন ও শিল্প কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তার কড়াকড়ি এবং নিয়মিত মহড়া নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ২১ অক্টোবর ২০২৬