পিজিসিবিতে আর্থিক অস্বচ্ছতার চাঞ্চল্যকর চিত্র
- এক্সেল শিটে শুভঙ্করের ফাঁকি: পিজিসিবির সিস্টেম থেকে ভাউচার ডিলিট, ‘কপি-পেস্ট’ মন্তব্যে নীরব অডিটর
- হাজার কোটি টাকার রাজস্বে ‘ম্যানুয়াল’ কারসাজি: পিজিসিবির অডিট রিপোর্টে তথ্যের লুকোচুরি ও স্ববিরোধী দাবি
➤ দেশের একমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বৃহৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। তিন হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করা এই প্রতিষ্ঠানে আধুনিক সফটওয়্যার থাকতেও আর্থিক নিরীক্ষা (অডিট) চলছে ম্যানুয়ালি তৈরি করা এক্সেল শিটের ওপর ভিত্তি করে।
কারণ, অডিট প্রতিবেদন তৈরির আগেই প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার ‘বিজনেস অপারেশন সিস্টেম (বস)’ থেকে অন্তত ২৬০টি ভাউচার সুকৌশলে মুছে ফেলা হয়েছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে লেনদেনের রেকর্ড গায়েব করে ম্যানুয়াল শিটে অডিট করানোর এই ঘটনা কেবল আর্থিক অস্বচ্ছতারই প্রমাণ নয়, এটি তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানির সুশাসন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর বড় ধরনের আঘাত।
কী ঘটেছে এবং কখন ঘটেছে?
অনুসন্ধান ও নথিপত্র বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিজিসিবির সফটওয়্যার থেকে ‘omar’ নামের একটি ইউজার আইডি ব্যবহার করে সুনির্দিষ্টভাবে ২৬০টি ভাউচার ডিলিট করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮টি ছিল ডুপ্লিকেট ভাউচার (দুবার ইনপুট দেওয়া)।
তথ্য মুছে ফেলার এই প্রক্রিয়াটি চলে ধাপে ধাপে। ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই এক দিনেই সর্বোচ্চ ৮৩টি ভাউচার ডিলিট করা হয়। এরপর ৩১ জুলাই ২টি, ১১ আগস্ট ৩টি, ১৩ আগস্ট ১টি, ১৭ নভেম্বর ৩টি এবং ১৮ নভেম্বর ২টি ভাউচার ডিলিট করা হয়।

স্ববিরোধী দাবি: কর্তাদের অস্বীকার বনাম অডিটরের স্বীকারোক্তি
ঘটনাটির সবচেয়ে দুর্বল ও হাস্যকর দিকটি ফুটে উঠেছে পিজিসিবি এবং তাদের নিরীক্ষকের স্ববিরোধী বক্তব্যে। পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মো. মনিরুজ্জামান দাবি করেছেন, তাদের ‘বস’ সফটওয়্যার থেকে কোনো তথ্য ডিলিট হয় না। তার যুক্তি, নতুন ইআরপি সফটওয়্যার (মাইক্রোসফট ৩৬৫) পুরোপুরি চালু না হওয়ায় পুরোনো সফটওয়্যার থেকে তথ্য এক্সেলে নিয়ে অডিটরদের দেওয়া হয়।
অথচ তাদেরই নিয়োগকৃত অডিট ফার্ম ‘একনাবীন’-এর পরিচালক মাহমুদুর রহমান স্পষ্ট স্বীকার করেছেন যে, ভাউচার মুছে ফেলার বিষয়টি তারা নিরীক্ষাকালে ধরেছেন।
কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এত বড় একটি জালিয়াতির ইঙ্গিত পাওয়ার পরও তারা মূল অডিট রিপোর্টে তা উল্লেখ করেননি। তাদের খোঁড়া যুক্তি—এর ‘উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক প্রভাব পাওয়া যায়নি’। তারা কেবল অভ্যন্তরীণ ‘ম্যানেজমেন্ট লেটার’-এর মাধ্যমে পিজিসিবিকে বিষয়টি জানিয়েই দায় সেরেছেন।
এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পিজিসিবি কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত এই কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৯ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। শেয়ারদর ৩৮ টাকার কাছাকাছি। এখানে সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল অর্থ লগ্নি করা আছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট রাজস্ব ছিল ৩ হাজার ৯৯ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার ৫৯১ টাকা এবং নিট লোকসান ছিল ২১০ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ৮০৭ টাকা (শেয়ারপ্রতি লোকসান ২.৩০ টাকা)।
এর আগের অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৬১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ও লোকসানের খাতায় থাকা একটি কোম্পানির সফটওয়্যার থেকে ‘অডিট ট্রেইল’ (তথ্য পরিবর্তন বা মোছার রেকর্ড) না রেখে ডেটা গায়েব করা কোম্পানি আইন ও করবিধির মারাত্মক লঙ্ঘন।
কপি-পেস্ট অডিট রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞের কড়া বার্তা
পিজিসিবির আগের অডিট রিপোর্টগুলো ঘাটলে আরও বড় দুর্বলতা চোখে পড়ে। ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে আইটি অডিট-সংক্রান্ত মন্তব্য ছিল হুবহু এক। এম জে আবেদীন অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার কামরুল আবেদীনের অযুহাত—পরিবেশ এক থাকলে মন্তব্য এক হওয়া স্বাভাবিক।
এই ধরনের অলস ও দায়সারা যুক্তির কড়া সমালোচনা করেছেন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী সৈয়দ জাহিদ হোসেন। তার মতে, আইটি সিস্টেম স্থির কোনো বিষয় নয়; প্রতি বছরই এর ঝুঁকি ও কনফিগারেশন বদলায়।
স্বাধীন পরীক্ষা ছাড়া আগের বছরের রিপোর্ট ‘কপি-পেস্ট’ করা অডিটের গ্রহণযোগ্যতাকেই ধুলায় মিশিয়ে দেয়। তিনি স্পষ্ট করেন, অডিট ট্রেইল ছাড়া ভাউচার মোছা ফৌজদারি অপরাধ এবং এটি প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করার উদ্দেশ্যেই করা হয়ে থাকতে পারে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র আবুল কালাম বিষয়টি "খতিয়ে দেখার" যে চিরাচরিত আশ্বাস দিয়েছেন, তা দিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কমবে না। মূল প্রশ্ন হলো—‘omar’ আইডিটি কার এবং এই ২৬০টি ভাউচারের আড়ালে ঠিক কী পরিমাণ অর্থের দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে?
জাতীয় গ্রিডের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের আইটি ও আর্থিক নিরাপত্তায় এমন ছিদ্র দ্রুত তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা না হলে, বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গাটি পুরোপুরি ধসে পড়বে। তথ্যসূত্র: আপন দেশ ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০৪ নভেম্বর ২০২৬