➤ ক্ষমতার পালাবদল বনাম ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা: ইসরায়েলের ভোটে ফিলিস্তিন ও ইরান নীতির ভবিষ্যৎ

➤ নেতানিয়াহু হারলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে বাধা ও ইরানবিরোধী নীতিতেই অটল থাকবে তেল আবিব

➤ অবরুদ্ধ গাজায় নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ, পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ এবং লেবানন থেকে ইরান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের উত্তাপের মাঝেই আগামীকাল ২৭ অক্টোবর ভোট দিতে যাচ্ছে ইসরায়েল। 

২৬তম নেসেট বা পার্লামেন্ট নির্বাচনের এই ভোটে তেল আবিবের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারিত হলেও, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে কি ফিলিস্তিন ও ইরান নিয়ে ইসরায়েলের কৌশলগত নীতি বদলাবে? 

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু হারলেও ইসরায়েলের মূল নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্টে এবার মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে ক্ষমতার মসনদে থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী ‘লিকুদ পার্টি’ জোট এবং বিরোধী ইহুদি জোট। 

ইসরায়েলি আইনে পার্লামেন্টে আসন পেতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তত ৩.২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদের সীমা না থাকায় দুর্নীতির মামলার বিচার চলমান থাকা সত্ত্বেও ফের নির্বাচনী ময়দানে দাপট দেখাচ্ছেন নেতানিয়াহু, যার পেছনে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন। তবে কোনো দল বা জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিয়ে জনজরিপগুলোতে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

নির্বাচনে যে দলেরই জয় হোক না কেন, ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা দেখছেন না রাজনৈতিক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকরা। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র বিভাজন থাকলেও ইসরায়েলের প্রধান দলগুলোর মধ্যে তিনটি সুনির্দিষ্ট নীতিতে কোনো মতভেদ নেই:

  • ইরানকে প্রধান অস্তিত্বগত শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা।
  • নিরাপত্তা নিশ্চিতে সামরিক শক্তির মারমুখী ও নিরঙ্কুশ ব্যবহার।
  • স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে সর্বাত্মক বাধা প্রদান।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি আরও বেশি আক্রোশমূলক রূপ নিয়েছে। তেল আবিবের বর্তমান সামরিক মতবাদ মূলত তেহরানের শক্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া, সীমান্তের বাইরে নিজেদের শক্ত সামরিক বলয় তৈরি রাখা এবং প্রতিপক্ষকে চূড়ান্তভাবে দমন করার ওপর নির্ভরশীল।

এই বাস্তবতায় নেতানিয়াহু যদি তার কট্টর ডানপন্থী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী মিত্রদের নিয়ে পুনরায় সরকার গঠন করেন, তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তার নেতৃত্বাধীন সরকার ইরানের ওপর সামরিক হামলা জোরদারের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রে আরও বেপরোয়া পদক্ষেপ নেবে।

অন্যদিকে, নির্বাচনে বিরোধী জোট বিজয়ী হলে অলৌকিক কোনো পরিবর্তনের আশা নেই। নতুন সরকার হয়তো বিশ্বদরবারে গাজা যুদ্ধের কারণে ক্ষুণ্ন হওয়া আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে কিছুটা নরম ও কূটনৈতিক সুর ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন বা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের (Two-state solution) মতো মৌলিক ইস্যুতে তারা নেতানিয়াহুর নীতিরই প্রতিধ্বনি করবে।

নেতৃত্ব বদলের এই নির্বাচন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আসল গতিপথ বদলাতে পারবে না। আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এটি কেবল পুরোনো নীতির মোড়ক পরিবর্তনের একটি মহড়া হয়েই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল, যেখানে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বরাবরের মতোই উপেক্ষিত থেকে যাবে। ◉

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ ২৬ অক্টোবর ২০২৬