২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের জেনারেলদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল ওয়াশিংটন। মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণতন্ত্র ধ্বংস এবং হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ হত্যার প্রতিবাদে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তবে পাঁচ বছর পর ভূ-রাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতায় সেই বরফ গলতে শুরু করেছে।
সম্প্রতি জাপানের রাজধানী টোকিও এবং মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী নেপিডোতে মার্কিন কর্মকর্তা ও মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকারের শীর্ষ প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে ওয়াশিংটন এখন চরম ‘লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি’ (transactional approach) গ্রহণ করছে।
সংকেত গোপন, সংলাপ স্পষ্ট: কী ঘটছে বৈঠকে?
সংবেদনশীল কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, টোকিওর সাম্প্রতিক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্সের নেতৃত্বে এক ডজনেরও বেশি আমেরিকান কর্মকর্তা অংশ নেন। এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নেপিডোতে ভ্যান্সের সাথে সরাসরি বৈঠক করেন অভ্যুত্থানের নায়ক ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়া মিন অং হ্লাইং।
আমেরিকান নাগরিক উদ্ধার এবং শত শত কোটি ডলারের অনলাইন স্ক্যাম ও প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধের তাগিদ এই আলোচনার প্রাথমিক অনুঘটক হলেও, পর্দার আড়ালে উন্মোচিত হচ্ছে আরও বড় স্বার্থের মানচিত্র। সম্প্রতি সামরিক বাহিনীর সহযোগী এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে—মিয়ানমার নীতিতে বড় পরিবর্তনের বাতাস বইছে।
বিরোধের কেন্দ্রে বিরল খনিজ ও চীন
উভয় পক্ষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে মিয়ানমারের বিপুল পরিমাণ ‘হেভি রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস’ বা ভারী বিরল মৃত্তিকা খনিজ। বৈদ্যুতিক গাড়ি, আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ও বায়ুকলে ব্যবহৃত এসব খনিজের বৈশ্বিক চাহিদার একটা বড় অংশ মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণে। বর্তমানে এ খনিজের বাজার এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে চীন।
বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের খনিজ সম্পদের নাগাল পেতে মরিয়া। তবে বাস্তবতা জটিল; এসব খনিজ সমৃদ্ধ অনেক এলাকা এখন জান্তাবিরোধী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দখলে। তদুপরি, বেইজিং নিজের প্রভাববলয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদচারণাকে সহজভাবে নাও দেখতে পারে।
জাপানের নীরব অনুঘটক ভূমিকা
জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করলেও জান্তার ওপর সরাসরি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। উল্টো দুই দেশের সংলাপ আয়োজনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখছে টোকিও।
জাপান ইস্টার্ন ট্রেড অর্গানাইজেশনের (JETRO) তথ্য অনুযায়ী, সংকট সত্ত্বেও প্রায় ৩০০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান মিয়ানমারে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। চীনের একচ্ছত্র প্রভাব ঠেকিয়ে এই উদীয়মান বাজারে নিজস্ব অর্থনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা টোকিওর অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য।
কূটনৈতিক স্তরে যখন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ মিলছে, তখন মিয়ানমারে গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ মুক্ত গণমাধ্যম সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। জান্তা সরকারের দমন-পীড়ন, সেন্সরশিপ এবং সংঘাতের তীব্রতায় মিয়ানমার বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের জন্য অন্যতম বিপজ্জনক অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
- গ্রেপ্তার ও নির্যাতন: অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত ২২০ জনেরও বেশি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় অর্ধশতাধিক সাংবাদিক কারাগারে বন্দি জীবনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
- প্রাণহানি: দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সামরিক হামলায় ও হেফাজতে অন্তত ১৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।
- আইনি নিপীড়ন: সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং নবপ্রণীত কঠোর নির্বাচনী সুরক্ষা আইনের মাধ্যমে মুক্ত সাংবাদিকতাকে সম্পূর্ণ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংবাদকর্মীরা এখন কেবল সামরিক বাহিনীর বন্দুকের মুখেই নন, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আর্থিক সংকট (দাতাগোষ্ঠীর তহবিল হ্রাস)—এই ত্রিমুখী ঝুঁকিতে জর্জরিত।
সংকট নিরসন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করণীয়
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ যদি তলানিতে গিয়ে ঠেকে, তবে তা সংঘাতগ্রস্ত অঞ্চলের জন্য চরম অশনিসংকেত ডেকে আনে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সমাজ ও পরাশক্তিগুলোর যা করণীয়:
১. গণমাধ্যমের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ: মিয়ানমারের ওপর পরিচালিত কূটনৈতিক আলোচনায় কড়াকড়িভাবে মুক্ত সাংবাদিকতা ও বন্দি সাংবাদিকদের মুক্তির শর্ত যুক্ত করতে হবে।
২. অর্থনৈতিক নীতির সাথে মানবাধিকারের সমন্বয়: বিরল খনিজ বা সাইবার অপরাধ দমনের স্বার্থে জান্তা সরকারকে বৈধতা দেওয়ার আগে মিয়ানমারে বেসামরিক প্রাণহানি বন্ধে স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা জারি করা প্রয়োজন।
৩. স্বাধীন গণমাধ্যমকে অর্থায়ন: সেন্সরশিপ এড়িয়ে নির্বাসিত এবং স্থানীয় সত্য প্রকাশকারী সংবাদমাধ্যমগুলোকে বৈশ্বিক তহবিল থেকে ধারাবাহিক সহায়তা দেওয়া জরুরি।
পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত লাভ-ক্ষতির অংকে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের মুক্তি ও মানবাধিকারের সংকট ঢাকা পড়ে যাচ্ছে কি না—এখন সেটাই বড় আন্তর্জাতিক প্রশ্ন।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ১৯ অক্টোবর ২০২৬