ঢাকা: হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রতিদিনই মৃত্যুর খাতায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিগত তিন দশকে এডিস মশা তার চরিত্র ও জীবনচক্র পাল্টে এতটাই ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে যে, বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অ্যান্ডেমিক’ বা ‘আঞ্চলিক মহামারি’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত দেড় দশকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশে ৩ হাজার ৮১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে গত পাঁচ বছরে, যখন প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ২২৩ জন। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
যেভাবে দেশে ছড়ালো ডেঙ্গু
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৬৪ সালে প্রথম ‘অজানা জ্বর’ হিসেবে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও পরে এটি এডিস মশাবাহিত রোগ হিসেবে শনাক্ত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকার পর ২০০০ সালে ডেঙ্গু প্রথম বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব বা আউটব্রেক ঘটায়, সে বছর ৯৩ জনের মৃত্যু হয়।
তবে দেশে এডিস মশার প্রবেশ ও বিস্তার নিয়ে ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়। ওই গবেষণার গবেষক ও তৎকালীন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ইন্দ্রানী ধর জানান, ১৯৯০-এর দশকের পর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো—বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ভারতে মেগা উন্নয়ন শুরু হলে ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তার দেখা যায়। সে সময় ওই দেশগুলো থেকে আসা বড় কার্গো জাহাজের মাধ্যমে এডিস মশা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে কি না, তা জানতেই গবেষণাটি শুরু হয়েছিল।
জলবায়ুর প্রভাব ও মশার মিউটেশন
গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। ১৯৯৭ সালের পর থেকে দেশের গড় তাপমাত্রা অন্তত দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। উষ্ণ পরিবেশ, উচ্চ আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাতের বৈচিত্র্য এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য তৈরি করেছে এক আদর্শ পরিবেশ।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের দেশে এখন সারা বছরই এর প্রভাব পড়ছে। আগে শীতকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ না থাকলেও এখন শীতেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
ধরন পাল্টাচ্ছে ডেঙ্গু, বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি
২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রায় ৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার সিংহভাগই ঘটেছে গত পাঁচ বছরে। এর পেছনে ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন বা সেরোটাইপ পরিবর্তনকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইইডিসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে ‘ডেন-২’ (Den-2) টাইপের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। অথচ এর আগের দুই বছর ‘ডেন-৩’ এবং ‘ডেন-৪’ ধরনের আধিপত্য ছিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, ভিন্ন ভিন্ন ধরনে একাধিকবার আক্রান্ত হলে রোগীর ‘শক সিনড্রোম’ ও মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কীটতত্ত্ববিদ ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, "গত কয়েক বছরে দেশে যখন ডেন-৩ ও ডেন-৪ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হলো, মূলত এরপর থেকেই ডেঙ্গুর তীব্রতা ও ভয়াবহতা মারাত্মক আকার ধারণ করে।"
মৌসুমভিত্তিক নয়, প্রয়োজন বছরব্যাপী পরিকল্পনা
এক দশক আগেও ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ দেখা যেত জুন-জুলাই মাসে। কিন্তু এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। বর্তমানে ডেঙ্গুর পিক সিজন বা সর্বোচ্চ সংক্রমণ হচ্ছে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে। পাশাপাশি এখন দেশের অন্তত ৫৭টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস।
২০০০ সালে প্রথম বড় প্রাদুর্ভাবের পর ২০০৩ সাল থেকে ডেঙ্গু বেশ কয়েক বছর নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেই সফলতার সূত্র ধরে ড. ইন্দ্রানী ধর বলেন, "মশার প্রজননস্থলগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করার বিকল্প নেই।"
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু আর শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়, এটি এখন সারা বছরের সংকট। তাই শুধু মৌসুমভিত্তিক ক্র্যাশ প্রোগ্রামের ওপর নির্ভর না করে, সারা বছরব্যাপী বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত মশক নিধন কর্মসূচি গ্রহণের তাগিদ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য ও কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ২৪ অক্টোবর ২০২৬