অশান্ত পোশাকখাত:
- মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শান্ত হয়নি রাজপথ: সাভার ও গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভে উত্তাল শিল্পাঞ্চল
- বেতন বৃদ্ধির দাবিতে অনড় শ্রমিকরা: কালিয়াকৈর-আশুলিয়ায় মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ
- ৫০০ কারখানা বন্ধ, একদিনে ৩৭৩ কোটি টাকার ক্ষতি: মজুরি বোর্ডের আশ্বাসেও কেন থামছে না পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন
➤ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে সরকার নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগেই মজুরি বোর্ড গঠন করলেও শান্ত হয়নি তৈরি পোশাকশিল্প খাত।
ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকরা সোমবারও (০২ নভেম্বর) রাজধানী ঢাকাসহ গাজীপুর ও সাভারের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন। মহাসড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার জেরে শিল্পাঞ্চলগুলো ছিল উত্তপ্ত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের অন্তত ৫০০টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ।
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ ও ভাঙচুর
সোমবার (০২ নভেম্বর) সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুর ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন পোশাকশ্রমিকরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
আন্দোলন চলাকালে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পল্লীবিদ্যুৎ ও মৌচাক এলাকায় অন্তত ৫০টি যানবাহনে ভাঙচুর চালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা মাঠে নামলে শ্রমিকদের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা ঘটে।
কালিয়াকৈর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম জানান, সকাল থেকেই শ্রমিকেরা বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুর চালান। পরে পুলিশি তৎপরতায় তাদের ছত্রভঙ্গ করা হলেও থেমে থেমে তারা পুনরায় সড়কে অবস্থানের চেষ্টা করছেন।
আশুলিয়ায় কারখানা ছুটি ঘোষণা ও সংঘর্ষ
বেতন বৃদ্ধিসহ তিন দফা দাবিতে ঢাকার সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও আজ শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছেন। সকালে নবীনগর-চন্দ্রা ও বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। নিশ্চিন্তপুর এলাকার নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ভেতরে প্রবেশ করে উৎপাদন বন্ধ রেখে কর্মবিরতি শুরু করেন এবং পরে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কে অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে জড়ো হন।

ছুটি ঘোষণার পর শ্রমিকরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম জানান, পুলিশ বুঝিয়ে ও মৃদু বল প্রয়োগ করে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের ধাওয়া
রোববারের (০১ নভেম্বর) ধারাবাহিকতায় আজও রাজধানীর মিরপুরে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন শ্রমিকরা। সকালে মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকায় জড়ো হয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
মিরপুর মডেল থানার ডিউটি অফিসার রোজিনা খাতুন জানান, পুলিশের বাধায় শ্রমিকরা রাস্তা থেকে সরে নিজ নিজ কারখানায় ফিরে গেছেন। উল্লেখ্য, রবিবার মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দিয়েছিলেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
মজুরি বোর্ড গঠন বনাম শ্রমিকদের দাবি
বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের নিয়ম রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল গঠিত মজুরি বোর্ডের সুপারিশে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ওই বছরের ডিসেম্বরে কার্যকর হয়। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে শ্রমিকরা বর্তমানে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবি তুলেছেন।
এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার রোববার (০১ নভেম্বর) নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগেই তড়িঘড়ি করে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়। কিন্তু শ্রমিকরা এই পদক্ষেপে সন্তুষ্ট না হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও মালিকপক্ষের উদ্বেগ
শ্রমিক আন্দোলনের মুখে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৫০০টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, এই অচলাবস্থার কারণে এক দিনে প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকার (৩০ মিলিয়ন ডলার) রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "কারখানা বন্ধ থাকার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে যে ক্ষতি হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও ভয়াবহ হবে। বায়ারদের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।" ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০২ নভেম্বর ২০২৬