ছুটির আনন্দে কক্সবাজারে গিয়ে এক বিভীষিকাময় সকালের মুখোমুখি হওয়া সেই পরিবারটির আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিমেষেই রূপ নিয়েছে প্রগাঢ় শোকে। কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার ‘টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে একই পরিবারের ছয় সদস্যের করুণ মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে, যাঁদের সবার মরদেহ পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ভোরের আতঙ্ক ও লেলিহান শিখার গ্রাস
শনিবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে মেরিন ড্রাইভের ওই রিসোর্টটিতে হঠাৎ আগুন লাগে। সম্পূর্ণ বাঁশ ও কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটি নিমেষেই লেলিহান শিখার গ্রাস চলে যায়। কক্সবাজার শহরের প্রবেশদ্বার কলাতলী থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরের এই পর্যটনকেন্দ্রে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই পুরো স্থাপনাটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, কাঠের তৈরি হওয়ায় আগুন মুহূর্তের মধ্যে পুরো বিল্ডিংয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
একটি পরিবারের তছনছ হয়ে যাওয়া স্বপ্ন
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই পরিবারটির মোট নয়জন সদস্য বেড়াতে এসেছিলেন রিসোর্টটিতে। দুর্ঘটনার সময় আগুনের লেলিহান শিখা দেখে হুড়োহুড়ি শুরু হয়।
বেঁচে যাওয়া স্বজন আশিকুল ইসলাম দুঃস্বপ্নের সেই সকালের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, ঘুম ভাঙার পর তার স্ত্রী আগুন দেখতে পান এবং তাকে দ্রুত ডেকে তোলেন। জীবন বাঁচাতে আশিকুল কোনোমতে একটি জানালা ভেঙে লাফ দিয়ে বাইরে বের হতে পারলেও তার স্ত্রী ভেতরেই আটকা পড়েন।
পরিবারের বাকি সদস্যদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে চলছে চরম উৎকণ্ঠা। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ও আশঙ্কাজনক এই ছয়জনের তালিকায় রয়েছে ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও মাত্র পাঁচ বছরের শিশু ফায়িজান আহম্মেদ।

এদিকে সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া সায়ানুল মান্নান ও তার স্ত্রী ফাহমিদাসহ আহত নয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সায়ানুলের বাবা আব্দুল মান্নান জানান, তার ছেলে ও পুত্রবধূ অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও দুপুরের পর বিমানে করে ঢাকার মিরপুরের পীরেরবাগে নিজেদের বাসায় ফিরে গেছেন। তবে স্বজনদের নিখোঁজ থাকার সংবাদে তাদের ঘরজুড়ে এখন শুধুই কান্না।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহতদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন এবং তাদের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। দগ্ধ এই পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তদন্ত কমিটি গঠন ও ডিএনএ টেস্টের সিদ্ধান্ত
ঘটনার পর কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এ এম সাজেদুর রহমান জানান, পরিবারটির নয়জন সদস্যের মধ্যে তিনজন সুস্থ থাকলেও বাকিরা নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাঁরা ওই আগুনে পুড়ে মারা গেছেন বলে জোরালো আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক আ. মান্নান জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পরই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি।
তবে রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে চার থেকে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ছুটির আনন্দ উদযাপনের চেনা মুখগুলো হঠাৎ করেই চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার এই বেদনায় এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো পরিবার ও স্বজনদের মাঝে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ১৭ অক্টোবর ২০২৬