নিঝুম রাতের ক্লান্তি শেষে ভোরের আলো তখনো ফুটেনি। বাসের জানালা দিয়ে আসা হিমেল হাওয়ায় অর্ধেকের বেশি যাত্রী গা এলিয়ে ঘুমে বিভোর। কেউ ভাবছিলেন গন্তব্যে পৌঁছে স্বজনদের মুখ দেখার কথা। কেউবা ভাবছিলেন সারাদিনের কর্মপরিকল্পনা। কিন্তু এক মুহূর্তের বিকট শব্দ আর নিমিষেই সবকিছু পরিণত হলো বিভীষিকাময় এক ধ্বংসস্তূপে। ভোরের ঘুমন্ত শহরকে জাগিয়ে তুলল কান্নার বীভৎস আর্তনাদ।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর সোয়া ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক সড়ক ট্র্যাজেডি।
বরিশাল ও কুয়াকাটা থেকে ছেড়ে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী ‘আরপি স্পেশাল’ পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। রক্তক্ষয়ী এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৪ জন, যার মধ্যে রয়েছে এক নিষ্পাপ কন্যাশিশুও। এছাড়া আহত হয়েছেন ৩০ জনেরও বেশি যাত্রী।
নিমিষেই ছিন্ন-ভিন্ন স্বপ্ন
দুর্ঘটনাস্থল যেন এক মুহূর্তেই রূপ নেয় কসাইখানায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দ্রুতগতির বালুবোঝাই ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসটির সংঘর্ষ এতটাই তীব্র ছিল যে দুটি গাড়ির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে একে অপরের ভেতরে ঢুকে যায়। বাসের স্টিয়ারিংয়েই পিষ্ট হয়ে মারা যান ড্রাইভার, আসন থেকে ছিটকে পড়ে বাসের ভেতরেই করুণ মৃত্যু হয় বহু যাত্রীর।
দুর্ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই বাসের ৯ থেকে ১০ জন যাত্রী প্রাণ হারান। পরে স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় ক্লিনিক, নাটোর জেনারেল হাসপাতাল এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পাঠালে পথিমধ্যে ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়।
নিহত ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জনই ছিলেন বাসের আরোহী এবং অপর জন ট্রাকচালক। হতাহতদের শরীর ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রক্তভেজা ব্যাগ-লগেজ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অনেকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরিচয় শনাক্তে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে কাজ শুরু করেছে।

ঘটনার পরপরই উদ্ধারকাজে অংশ নেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাসের ধাতব পাত কেটে কেটে বের করা হয় আটকে পড়া রক্তাক্ত দেহগুলোকে। দুর্ঘটনার পর ক্ষণিকের জন্য নাটোর-পাবনা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও ট্রাকটি সড়ক থেকে সরিয়ে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ভোর সকালেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার লায়লা জান্নাতুল।
হাইওয়ে থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান, "এটি একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা। আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্তের পাশাপাশি স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তরের কাজ চলছে।" জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে জরুরি আর্থিক সহায়তা ও আহতদের চিকিৎসার সার্বিক তদারকির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা
বাংলাদেশে মহাসড়কে মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং বেপরোয়া গতির বলি হওয়া নতুন কিছু নয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ARI) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
মহাসড়কে বেপরোয়া গতি: দেশের মহাসড়কগুলোতে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশই ঘটে অতিরিক্ত গতি এবং চালকদের ওভারটেকিংয়ের বেপরোয়া মানসিকতার কারণে।
দূরপাল্লার ক্লান্তি: দূরপাল্লার বাসে একজন চালক একটানা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালান। ভোরে চালকের চোখ লেগে আসা বা ঝিমুনি নাটোর-পাবনার মতো দীর্ঘ মহাসড়কে অগণিত দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
অবৈধ যান ও বালুর ট্রাক: মহাসড়কে বালুবোঝাই ট্রাক বা আনফিট যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল রাতে ও ভোরে দুর্ঘটনার ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, শোকের সাগরে ভাসে কয়েকটি পরিবার, কিন্তু মহাসড়কের শৃঙ্খলা যেন অধরাই থেকে যায়। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কেবল সান্ত্বনা নয়, কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন:
১. চালকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ: দূরপাল্লার রুটে বাধ্যতামূলকভাবে বিকল্প চালক (ডাবল ড্রাইভার) রাখা নিশ্চিত করা।
২. গতি নিয়ন্ত্রক প্রযুক্তি: মহাসড়কে স্পিড গভর্নার ও সিসিটিভি ক্যামেরার কঠোর প্রয়োগ করা।
৩. নৈশকালীন মনিটরিং: রাত ৩টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত মহাসড়কগুলোতে হাইওয়ে পুলিশের টহল ও চালকদের সচেতনতামূলক বিরতি নিশ্চিত করা।
বনপাড়ার ভোরে নিহত ১৪টি পরিবারের কাছে সময় যেন থমকে গেছে। পরম আত্মীয়কে জড়িয়ে ধরার যে প্রতীক্ষা নিয়ে তারা ভোরের অপেক্ষায় ছিলেন, সেই প্রতীক্ষা এখন ঢেকে গেছে মর্গের শীতল নিস্তব্ধতায়। রাজপথের এই রক্তস্রোত বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখনই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ২০ অক্টোবর ২০২৬