মনুমেন্তাল জুড়েই আবেগের হাওয়া। কেউ কাঁদছেন, কেউ বিশ্বাসই করতে পারছেন না, আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর খেলবেন না লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটা খেলার পর আবেগি হয়ে পড়লেন মেসিও।
ম্যাচ শেষে মেসি এক আবেগঘন বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি তার ২১ বছরের আলবিসেলেস্তে ক্যারিয়ার জুড়ে পাশে থাকার জন্য সতীর্থ ও ভক্তদের প্রতি জানান কৃতজ্ঞতা। কথা বলেন ২০২৬ বিশ্বকাপ, প্রয়াত বাবা হোর্হে, আর ক্যারিয়ার নিয়ে। সেরা মুহূর্ত নিয়ে বলেছেন,‘জাতীয় দলের হয়ে খেলাটাই জীবনে ঘটা সেরা ঘটনা।’
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে একটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করার পর মেসি তার বক্তব্য শুরু করেন এভাবে,‘আজ কিছু বলা সত্যিই কঠিন, অনেক কথা মনে ভিড় করছে। এই মুহূর্তে সবার আগে আমার বাবার কথাই মনে পড়ছে। আমার একটাই কাজ—কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জার্সি গায়ে জড়াতে পারা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের বিষয় ছিল।’
মেসি এরপর যোগ করেন, ‘সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোতেও আমি কখনো লড়াই থামাইনি, নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি। আর কখনো ফিরে আসতে না পারাটা অনেক কষ্টের হবে। ঈশ্বরের দোহাই, আমি সারাজীবন ফিরে আসতে চাইতাম, কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলাটাই আমার জীবনে ঘটা সেরা ঘটনা।’
মেসি স্বীকার করেন, সরে দাঁড়ানোর জন্য এটিই ‘সঠিক সময়’। তিনি বলেন, ‘আমি অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে গেছি। ২০২৬ বিশ্বকাপে আমরা অর্জনের খুব কাছাকাছি ছিলাম, আর সত্যি বলতে [স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে] কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি যা অনেকে বলছে। আমরা আমাদের সবটুকু দিয়েছিলাম; ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি আমাদের দারুণভাবে ক্লান্ত করে দিয়েছিল। আমরা বরাবরের মতোই কঠোর লড়াই করেছি, কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে এসে আর পেরে উঠিনি।

ভাষণের পরের অংশে সতীর্থদের ধন্যবাদ জানিয়ে মেসি বলেন, ‘তারা আমার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করেছে—বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং ফিনালিসিমা জয়। মাঠে তোমাদের পাশে দাঁড়াতে পারাটা অনেক বড় সম্মানের ছিল। এর মানে ছিল যেকোনো দলের বিপক্ষে লড়াইয়ে নেমে পড়া, কারণ আমি জানতাম আমার সঙ্গে এমন সব যোদ্ধা আছে যারা নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দেবে।’
তিনি আরও যোগ করেন,‘আমরা সবসময় কঠিন লড়াই করেছি, সবার সঙ্গে। কেবল যাদেরকে আমি হারিয়েছি তাদের সঙ্গেই নয়, বরং আমার আগে যারা খেলে গেছেন তাদের সঙ্গেও। দুর্ভাগ্যবশত, কাছাকাছি গিয়েও আমরা চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে পারিনি, তবে আমার কোনো সন্দেহ নেই যে আমার পাশে থাকা সব সতীর্থই এই জার্সির জন্য সবসময় তাদের সেরাটা দিয়েছেন। এখানকার খেলাটা আমি বড্ড মিস করব।
পুরো দেশজুড়ে ভ্রমণ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবসময় দারুণ ভালোবাসা পেয়েছি। আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। ম্যাচ যাই হোক না কেন, স্টেডিয়াম যখন কানায় কানায় পূর্ণ থাকত, সেই পুরো সময়টার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। সারা দেশের মানুষ সব জায়গায় অনেক বড় কষ্ট স্বীকার করে খেলা দেখতে এসেছে। আমরা জানি এটা কতটা কঠিন। সব জায়গায় খেলতেই আমাদের মনে হতো যেন নিজেদের ঘরের মাঠেই খেলছি।’
কৃতজ্ঞতার রেশ ধরে মেসি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা একটি দিনের কথা তুলে ধরেন—২০২২ বিশ্বকাপ জেতার পর তারা যখন মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে খেলতে ফিরেছিলেন। তিনি বলেন, ‘সেদিন আমি যা অনুভব করেছি তা কখনো ভুলব না। সেটি ছিল আমার জীবনের সেরা ঘটনা। এটি অসাধারণ সুন্দর ছিল। আজও আমি সেই ভিডিওগুলো দেখি আর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি।’
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে লড়াই করাটা আমি খুব মিস করব।তবে আমি অন্য প্রান্তে আপনাদের সঙ্গেই থাকব, এই ছেলেগুলোকে এবং পরবর্তীতে যারা আসবে তাদের সমর্থন করে যাব। আমরা সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকব। প্রমাণ হয়ে গেছে যে আমরা যখন একতাবদ্ধ থাকি, তখন আমরা যেকোনো কারও চেয়ে শক্তিশালী এবং যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে পারি।
সামনে নিশ্চিতভাবেই কঠিন সময় আসছে, কারণ এই সময়ে যা অর্জিত হয়েছে তা অসাধারণ, আর তাই এখন আগের চেয়েও বেশি তাদের পাশে থেকে সমর্থন জোগাতে হবে। বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী দল গড়ে তুলতে হবে। এমন অনেকে আছেন যারা জাতীয় দলকে ব্যর্থ হতে দেখতে চান, তাদের সেই সুযোগ আমাদের দেওয়া যাবে না।’
তিনি স্পষ্ট জানান যে কঠিন সময় পার করার একমাত্র উপায় হলো শক্তিশালী দল গড়ে তোলা। জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের এখনই বলতে পারি, আমরা একটি অসাধারণ দল ছিলাম, আর সে কারণেই আমরা যা কিছু অর্জন করেছি তা সম্ভব হয়েছে।’
সবশেষে, মেসি কিছুটা হেসে স্বীকার করেন যে তিনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছেন, কারণ তিনি মাঠ ছেড়ে যেতে চাইছেন না। এরপর আবেগময় কণ্ঠে ভাষণ শেষ করে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু বলতে চাই যে আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি এবং খুব মিস করব। আমি একজন আর্জেন্টাইন হতে পেরে এবং আপনাদের সবার সঙ্গে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে গর্বিত। আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ, আমি আপনাদের ভালোবাসি।’
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬