যুদ্ধের খরচ সীমান্তে থামে না। কৃষ্ণসাগরে শস্যবাহী জাহাজের চলাচল ব্যাহত হলে, হরমুজে জ্বালানির সরবরাহ আটকে গেলে কিংবা লোহিত সাগরে জাহাজকে ঘুরপথে চলতে হলে তার চাপ বাংলাদেশের বাজার, কারখানা ও পরিবারের হিসাবে পৌঁছাতে পারে। ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সংঘাতগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তাই আমদানি, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার নিরাপত্তার প্রশ্ন।

১ অক্টোবরের গার্ডিয়ানে লেখা একটি কলামে নাসরিন মালিক নিউইয়র্কের জাতিসংঘ অধিবেশনের ব্যর্থতার প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের জন্য আলোচনাটির বাস্তব দিক হলো, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রয়োজনীয় পণ্যের নিশ্চয়তা কমে এবং ব্যবসার পরিকল্পনা কঠিন হয়। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলি অভিযান ও ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘাতের কারণ ও দায় আলাদা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক অভিঘাত একই দেশে এসে জমতে পারে।

এই চাপের প্রধান পথ সমুদ্রবাণিজ্য। ১৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে দেওয়া বক্তব্যে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএনসিটিএড জানায়, পরিমাণের হিসাবে বিশ্ব পণ্যবাণিজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি সমুদ্রপথে চলে। আগস্টের শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়ার কিছু পথে তেলবাহী জাহাজের ভাড়া টনপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তিন গুণ।

বাংলাদেশের জন্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য মাত্রা দেখিয়েছে ইউএনসিটিএডের ২ জুনের মূল্যায়ন। ২০২৪ সালের আমদানির পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকলে তেলের দাম ৫০ শতাংশ বাড়ার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বার্ষিক তেল আমদানির খরচ মোট দেশজ উৎপাদনের শূন্য দশমিক ৮ শতাংশের সমপরিমাণ বাড়তে পারে। এটি একটি শর্তসাপেক্ষ হিসাব।

f568ad89-e2db-4687-a40a-3e2bfcaacc16.jpg 37.68 KB
তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়লে তার প্রভাব বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনে ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। সরকার বাড়তি খরচ ভর্তুকি দিয়ে সামলালে বাজেটে চাপ পড়ে; দাম সমন্বয় করলে পরিবার ও ব্যবসার ব্যয় বাড়ে। সরবরাহ অনিয়মিত হলে কারখানার উৎপাদনসূচিও বিঘ্নিত হতে পারে। ফলে জ্বালানির সংকট শুধু একটি আমদানি বিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

খাদ্যের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ৪ সেপ্টেম্বরের বাংলাদেশ মূল্যায়নে ২০২৬–২৭ বিপণন বছরে গম আমদানির প্রয়োজন ৬৮ লাখ টন ধরা হয়েছে। কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পরিবহন ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা এই বাজারের ঝুঁকি বাড়ায়। আবার হরমুজের বিঘ্ন সারের বাজারেও প্রভাব ফেলে। ইউএনসিটিএডের হিসাবে বৈশ্বিক সমুদ্রবাহিত সারবাণিজ্যের প্রায় এক তৃতীয়াংশ সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে যায়।

অবশ্য যুদ্ধ থাকলেই প্রতিটি পণ্যের দাম একটানা বাড়বে, এমন সরল হিসাবও চলে না। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে আটার দাম বাড়লেও জুলাইয়ে তা আগের বছরের তুলনায় সামান্য কম ছিল। ভালো ফসল, বিকল্প সরবরাহকারী ও মজুত চাপ কমাতে পারে। স্থানীয় কর, বিনিময় হার এবং বাজার ব্যবস্থাপনাও শেষ পর্যন্ত ভোক্তার দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

একই মূল্যায়নে সেপ্টেম্বর–ডিসেম্বরে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষের তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। সংস্থাটি ক্রয়ক্ষমতার দুর্বলতা, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় ও বন্যার প্রভাব উল্লেখ করেছে। যুদ্ধের ধাক্কা তাই দেশের বিদ্যমান সংকটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

রপ্তানিকারকের ঝুঁকি আসে অন্যভাবে। জাহাজ ঘুরপথে গেলে পণ্য পৌঁছাতে সময় ও অর্থ বেশি লাগে। অর্থও দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। সময়মতো সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল পোশাক রপ্তানিতে এমন অনিশ্চয়তা প্রতিযোগিতা দুর্বল করতে পারে। ৮ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে ইউএনসিটিএড সতর্ক করেছে, জ্বালানি, পরিবহন, বিমা ও অর্থায়নের বাড়তি খরচ ছোট ও মাঝারি ব্যবসার ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ ফেলতে পারে।
bec2eaf8-a88e-4e44-aade-075b892b7484.jpg 194.09 KB
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার আরেকটি সংযোগ প্রবাসী কর্মী। উপসাগরীয় অর্থনীতিতে উৎপাদন, নির্মাণ বা ব্যবসা ব্যাহত হলে বাংলাদেশিদের কাজ ও আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের দুর্বল প্রবৃদ্ধি থেকে কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ে সম্ভাব্য চাপের কথা বলা হয়েছে। নিরাপত্তার অবনতি হলে কর্মীদের সুরক্ষা ও দেশে ফেরানোর প্রস্তুতিও বাংলাদেশের দায়িত্বের অংশ হয়ে ওঠে।

তবে সাম্প্রতিক হিসাবে প্রবাসী আয় বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আগস্টের হালনাগাদ অনুযায়ী, জুলাই–আগস্টে এসেছে প্রায় ৫৮৩ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি। ফলে সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং বর্তমান আয়প্রবাহের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। বাড়তি আমদানি খরচের বিপরীতে এই আয় বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা।

সুদান, গাজা ও ইউক্রেনে মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি সহায়তার অর্থসংকটও বাংলাদেশের উদ্বেগ। ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলার চাওয়া হয়েছে; যা আগের বছরের চেয়ে ২৬ শতাংশ কম। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, প্রয়োজন কমেছে বলে আবেদন কমানো হয়নি; সম্ভাব্য অর্থসংকটে আবেদন সংকুচিত হয়েছে। সহায়তা কমলে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য সেবায় চাপ বাড়ে।

এই পরিস্থিতি কূটনীতির প্রাতিষ্ঠানিক সীমাও সামনে আনে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আলোচনা ও সুপারিশ করতে পারে। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব নিরাপত্তা পরিষদের। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্থায়ী সদস্যের ভেটোয় আটকে যেতে পারে। যুদ্ধরত পক্ষ কিংবা তাদের মিত্রের স্বার্থ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করলে বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা ও বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার জন্য কার্যকর সমঝোতা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

এগুলো একটি বিচ্ছিন্ন দিনের ধাক্কা নয়; দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও বারবার সরবরাহ বিঘ্নের সম্মিলিত ঝুঁকি। তবে সব মূল্যবৃদ্ধির দায় যুদ্ধের ওপর চাপালে দেশের নিজস্ব দুর্বলতাগুলো আড়ালে থেকে যায়।

বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে তাই বিকল্প জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহকারী, প্রয়োজনীয় মজুত, পরিবহনব্যয়ের নজরদারি এবং প্রবাসীদের সুরক্ষা গুরুত্ব পাবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপদ নৌপথ ও মানবিক সহায়তার অর্থায়ন নিয়ে ধারাবাহিক উদ্যোগও প্রয়োজন। যুদ্ধ থামানোর আলোচনা সফল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার সুযোগ পরিবার বা ছোট ব্যবসার নেই। তাদের জন্য কূটনীতির কার্যকারিতা মাপা হবে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, কাজের নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় দিয়ে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৩ অক্টোবর ২০২৬