শিক্ষাঙ্গনে মব: আদালতের রায় আছে, বাস্তবায়ন নেই: জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শিক্ষকদের আর্তনাদ। শিক্ষক লাঞ্ছনায় আন্তর্জাতিক তদন্তের মুখে বাংলাদেশ: ন্যায়বিচারের আশায় ‘পদবঞ্চিত শিক্ষক জোট’
ঢাকার ধামরাইয়ের একটি ৮৫ বছরের পুরোনো জীর্ণ গ্রামীণ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার। কঠোর পরিশ্রমে বিদ্যালয়ের পাসের হার রেকর্ড ৯৫ শতাংশে উন্নীত করেছিলেন তিনি। দুবার নির্বাচিত হয়েছিলেন উপজেলার সেরা প্রধান শিক্ষক। কিন্তু ক্লাস ফাঁকি ও কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ করে শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফেরানোই যেন তার কাল হয়েছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীদের উসকে দিয়ে ১৫-২০ জনের একটি দল তার বাসায় হামলা চালিয়ে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে সই নেয়। পরবর্তীকালে সব সরকারি ও নিরপেক্ষ তদন্তে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হন, এমনকি আদালত তার পদত্যাগপত্র বাতিল করে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। তবু আজও তিনি নিজ কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি।
শুধু আনোয়ারুল ইসলাম নন, ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর তথ্যমতে, গত দুই বছরে সারা দেশে প্রায় দুই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪,৫০০ জন শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান এমন মব বা সংঘবদ্ধ হয়রানি, নির্যাতন ও জোরপূর্বক পদত্যাগের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষক রয়েছেন।
মবের পেছনের আসল চিত্র
শিক্ষাঙ্গনে এই মব বা সংঘবদ্ধ সহিংসতার বড় কারণ মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল এবং ব্যক্তিগত আক্রোশ। যেসব প্রতিষ্ঠানপ্রধান অনিয়ম-দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রাইভেট-কোচিং বন্ধ করেছিলেন, তারাই স্থানীয় প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েন।
সরকার পতনের পর রাজনৈতিক ক্যাডার, ফেল করা ছাত্র এবং বহিরাগতদের উসকে দিয়ে এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে ‘মব’ তৈরি করা হয়। ফরিদপুরের সালথায় অধ্যক্ষকে হাতুড়িপেটা করে রক্তভেজা পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া কিংবা কুমিল্লার দেবীদ্বারে প্রধান শিক্ষককে তাড়িয়ে তার চেয়ারে বসে এক ছাত্রের উল্লাসের ছবি—এই ভয়াবহ বাস্তবতারই কিছু খণ্ডচিত্র।
অমানবিক জীবনযাপন ও মৃত্যুর মিছিল
শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থা চরম হতাশাজনক। হয়রানি ও মানসিক আঘাত সইতে না পেরে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকে অন্তত আটজন শিক্ষক মারা গেছেন। পাঁচ শতাধিক শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

কাগজে-কলমে আইন, বাস্তবে শূন্য
শিক্ষকদের সম্মান ও অধিকার ফিরিয়ে দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আদালত একাধিক কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করে জোরপূর্বক নেওয়া পদত্যাগপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। ২০২৫ সালে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন, শিক্ষকদের স্বপদে বহাল ও বেতন চালু না করলে ম্যানেজিং কমিটি ভেঙে দেওয়া হবে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি সর্বশেষ পরিপত্রে বলা হয়, শিক্ষকদের বেতন আটকে রাখলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও সুবিধা বাতিল করা হবে।
এতসব আইন ও নির্দেশের পরও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রভাব নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (কলেজ) সাইয়েদ এ জেড মোরশেদ আলী জানান, মন্ত্রণালয় ও আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে ম্যানেজিং কমিটি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা তা মানছেন না। তারা বেতন-ভাতার কাগজপত্র ফরোয়ার্ড করছেন না, ফলে মাসের পর মাস শিক্ষকরা বেতনহীন রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক তদন্তের মুখে বাংলাদেশ
দেশীয় প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতা ও স্থানীয় বাধার মুখে ন্যায়বিচার না পেয়ে শিক্ষকরা এবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দ্বারস্থ হয়েছেন। শিক্ষাঙ্গনে এই মব সহিংসতা তদন্তে ২৩ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করবেন জাতিসংঘের শিক্ষা অধিকারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শাহিদ। তিনি সরাসরি ভুক্তভোগী শিক্ষক, লাঞ্ছিত শিক্ষার্থী এবং মৃত শিক্ষকদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলবেন।
শিক্ষাবিদদের চরম উদ্বেগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ এই পরিস্থিতিকে শিক্ষাব্যবস্থার ‘চরম অবনতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, “কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার আইনি বিচার হবে। কিন্তু ক্লাসরুমে শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা মানবাধিকার পরিপন্থি এবং একটি জঘন্য সংস্কৃতি। এর দায়ভার রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে পুরো সমাজব্যবস্থাকে নিতে হবে।”
যে শিক্ষকরা সমাজ গড়ার কারিগর, আজ তাদেরই রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজেদের সম্মান ও বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারের জন্য লড়তে হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনের এই নৈরাজ্য দ্রুত বন্ধ করে শিক্ষকদের সম্মানজনক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়া না হলে, তা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ারই শামিল হবে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ১৯ অক্টোবর ২০২৬