আইএমএফের পরিসংখ্যানে সাফল্যের আড়ালে কীসের ইঙ্গিত?
- মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে বাংলাদেশ, তবে ক্রয়ক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধিতে ভিন্ন চিত্র
- পরিসংখ্যানে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বস্তি, তবে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটে চাপে ঢাকার অর্থনীতি
➤ ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় আট গুণ বড়। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক (অক্টোবর ২০২৬)’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে ভারতকে পেছনে ফেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
পরিসংখ্যানগত এই অর্জনকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হলেও, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীরগতির প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে এই অগ্রগতি ধরে রাখা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জিডিপি, মাথাপিছু আয় এবং প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা
আইএমএফের তথ্যমতে, ১৭ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ২০২৬ সালে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। অন্যদিকে, এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারতের জিডিপির আকার দাঁড়াবে ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। কিন্তু মোট জিডিপিকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে, যা ভারতের (২,৭৪৯ ডলার) চেয়ে বেশি।
তবে মাথাপিছু আয় দিয়ে অর্থনীতির সম্পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি (PPP) পদ্ধতিতে হিসাব করলে বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন। জীবনযাত্রার ব্যয় ও পণ্যের দাম বিবেচনায় ২০২৬ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি (পিপিপি) হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার, যেখানে বাংলাদেশের হবে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার।
অর্থাৎ, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় ভারতীয়রা বাংলাদেশিদের চেয়ে এগিয়ে। আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, আর ভারতে তা মাত্র ৫ শতাংশ। এর সুস্পষ্ট অর্থ হলো, বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ অনেক বেশি।

চলতি বছর ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের প্রাক্কলিত ৩ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় উভয় দেশই বেশ পিছিয়ে—উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর গড় মাথাপিছু জিডিপি ৭ হাজার ৭৪৬ ডলার এবং বিশ্ব গড় ১৫ হাজার ৮৮৯ ডলার।
আইএমএফ বলছে, আগামী বছর (২০২৭) বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ২১৯ ডলারে পৌঁছাবে, যা তখনো ভারতের (৩,০৩৬ ডলার) চেয়ে বেশি থাকবে। তবে প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সাল নাগাদ ভারত (৩,৬৬১ ডলার) পুনরায় বাংলাদেশকে (৩,৩৩৪ ডলার) ছাড়িয়ে যাবে।
অর্থনীতির চালিকাশক্তি ও কাঠামোগত পার্থক্য
বাংলাদেশের এই সাফল্যের পেছনে মূলত তিনটি বিষয় কাজ করেছে—৩৮ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এবং পণ্য উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রসার অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
২০১৪ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান ছিল ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে, ভারতের ক্ষেত্রে তা ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।
তবে ভারতের অর্থনীতি অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। কৃষি বা শিল্পের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার দেশটির অর্থনীতির বড় শক্তি, যা যেকোনো বৈশ্বিক ধাক্কা সামলাতে তাদের সাহায্য করে।
ভূরাজনৈতিক সংকট ও বাংলাদেশের কৌশলগত ঝুঁকি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো রপ্তানির অতি-নির্ভরতা। মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে শুধু তৈরি পোশাক খাত থেকে। বর্তমানে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৯৫ শতাংশই আমদানি করে এবং এর সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। নৌপথে এই অস্থিরতা একদিকে যেমন ঢাকার জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
অন্যদিকে বিদেশে পোশাক রপ্তানির সরবরাহ চেইনকেও (সাপ্লাই চেইন) কঠিন করে তুলেছে। অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য না আনলে শুধুমাত্র একটি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ ২৭ অক্টোবর ২০২৬