সেপ্টেম্বরের এক তপ্ত দুপুর। রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিআরএইচ) নিচতলায় রেডিওথেরাপির অপেক্ষায় ঝিমুচ্ছেন ৪২ বছর বয়সী সবুজ মিয়া। পাশে বসা স্ত্রী নূরুন্নাহারের চোখেমুখে রাজ্যের দুশ্চিন্তা।
কক্ষের বাইরে অপেক্ষমাণ শতাধিক মানুষের ভিড়—বসার জায়গা না পেয়ে অনেকেই হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে আছেন। দেশের একমাত্র সরকারি এই বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতালে এটিই এখন নিত্যদিনের দৃশ্য।
একদিকে ক্যানসারের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব, অন্যদিকে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলের তীব্র সংকট—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চিকিৎসার আগেই নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার।
চিকিৎসার ব্যয়ে সর্বস্বান্ত সাধারণ মানুষ
কিশোরগঞ্জের রাজমিস্ত্রি সবুজ মিয়ার ট্রাকিয়াল ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতালে কেমোথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসায় লাখ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বাধ্য হয়ে শেষ সম্বল ভিটেমাটিটুকু ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন তারা।
বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেলেও ঢাকায় বাসা ভাড়া ও যাতায়াত মিলিয়ে খরচ মেটাতে দিশেহারা তার পরিবার। স্ত্রী নূরুন্নাহার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে কোথায় থাকব, জানি না।"
একই পরিণতি পটুয়াখালীর মাদ্রাসা বাবুর্চি নূর আহমেদের (৬০)। জমানো জমি বিক্রি করে এরই মধ্যে চার লাখ টাকা খুইয়েছেন তিনি। এখন মাদ্রাসার ২৫ হাজার টাকা অনুদান সম্বল করে স্ত্রীর হাত ধরে ক্যানসার হাসপাতালে অপেক্ষায় আছেন এই বৃদ্ধ।
সবচেয়ে মর্মান্তিক গল্পটি দেড় বছরের শিশু তানিশার। সঠিক সময়ে অস্ত্রোপচার না হওয়ায় একটি চোখ হারাতে হয়েছে তাকে। বিভিন্ন হাসপাতালে দৌড়াতে দৌড়াতে কালক্ষেপণের পাশাপাশি তার চিকিৎসায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ শিশুটির বাবা স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, যার চিকিৎসাতেই পরিবারটি এর আগে ৫ লাখ টাকা খুইয়েছে।
বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ঠিক কত, তার কোনো সুনির্দিষ্ট জনসংখ্যাভিত্তিক রেজিস্ট্রি নেই। তবে এনআইসিআরএইচ-এর ক্যানসার এপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম জানান, রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। গত বছর হাসপাতালটির বহির্বিভাগে ৪২ হাজার ৪৯৪ জন রোগী এসেছিলেন, যার মধ্যে ৩১ হাজার ৪৬ জনই নতুন ক্যানসার রোগী। অথচ ২০২০ সালে মোট রোগী ছিল ২৬ হাজার ২০২ জন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা শাখা ‘গ্লোবোক্যান’-এর পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ। ২০২২ সালে দেশে নতুন ক্যানসার রোগী ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন, যা ২০২৪ সালে প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৩ জনে। একই সময়ে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর হার ১৯ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯০৬ জনে ঠেকেছে। ধারণা করা হয়, বাস্তবে দেশে ১০ থেকে ১৫ লাখ ক্যানসার রোগী রয়েছেন।
সরঞ্জাম ও জনবলের হাহাকার
রোগীর এই বিপুল চাপের বিপরীতে চিকিৎসা পরিকাঠামো একেবারেই অপ্রতুল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য অন্তত একটি রেডিওথেরাপি মেশিন থাকা প্রয়োজন। সে হিসাবে বাংলাদেশে ১৭০টি মেশিন দরকার, কিন্তু সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে আছে মাত্র ৩০টি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২৩টি রেডিওথেরাপি মেশিনের ব্যবস্থা থাকলেও চালু আছে মাত্র ৭টি।
জনবলের চিত্র আরও করুণ। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির মানদণ্ড অনুযায়ী, দেশে ৭০০ থেকে ৮০০ জন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট প্রয়োজন, কিন্তু আছেন মাত্র ২৬০ জন। ১০০০ টেকনোলজিস্টের জায়গায় আছেন মাত্র ২০০ জন।
এই সংকটের কারণে চিকিৎসার দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা তৈরি হয়েছে। জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ১০০ নতুন রোগী রেডিওথেরাপির জন্য আসেন, অথচ আগে থেকেই অপেক্ষমাণ তালিকায় আছেন প্রায় ৮ হাজার রোগী! হাসপাতালের দুটি মেশিন সকাল ৮টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চালিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ২৫০ জনকে সেবা দেওয়া যাচ্ছে।
হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক মোস্তফা আজিজ সুমন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "এই গতিতে চললে অপেক্ষমাণ তালিকা শেষ করতে অনেক দীর্ঘ সময় লাগবে। বাস্তবতা হলো, ২০২৮ সালের মধ্যেও আমরা সব রোগীকে রেডিওথেরাপি সেবা দিতে পারব না।" গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি জানান, মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের রেডিওথেরাপি শুরু করতে প্রতি চার সপ্তাহের বিলম্ব রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি ৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
আশার আলো
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সম্প্রতি তিনি জানান, আগামী বছরের জুনের মধ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১৭টি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি ঢাকায় ও বাকিগুলো ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে দেওয়া হবে। জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালেও নতুন করে ৪টি মেশিন স্থাপন করা হবে।
সরঞ্জাম ও জনবল সংকটের এই দুষ্টচক্রে পড়ে ক্যানসার রোগীরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। চিকিৎসার দীর্ঘ সিরিয়াল আর ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের এই চিত্র দ্রুত পরিবর্তন না হলে, দেশের স্বাস্থ্য খাতে ক্যানসার এক নীরব মহামারির রূপ নেবে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬