ক্যাশলেস বাংলাদেশের পথে এক ধাপ
- তিন মাসে বাংলা কিউআর লেনদেন বেড়েছে পাঁচ গুণ
- নগদ টাকাকে বিদায় জানাচ্ছে মানুষ: দিনে ১৪৩ কোটির লেনদেনে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘বাংলা কিউআর’
- বদলে যাচ্ছে লেনদেনের চিত্র: চার্জ ফ্রি হওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়ছে
➤ মতিঝিলের ক্ষুদ্র মুদি দোকানি আব্দুল মোতালেব। একসময় ডিজিটাল লেনদেন বলতে কিছুই বুঝতেন না। কিন্তু এখন তার দোকানে আসা অনেক ক্রেতাই পকেট থেকে নগদ টাকা বের করার বদলে মোবাইল ফোন দিয়ে একটি কিউআর কোড স্ক্যান করে পণ্যের দাম মিটিয়ে দেন।
মোতালেবের এই রূপান্তর আসলে পুরো বাংলাদেশের ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। আর এই রূপান্তরের মূল কারিগর হলো—‘বাংলা কিউআর’ (Bangla QR)।
বাংলা কিউআর কী এবং কেন এটি আলাদা?
আগে বিভিন্ন ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) জন্য দোকানে আলাদা আলাদা কিউআর কোড রাখতে হতো। এক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক অন্য প্রতিষ্ঠানের কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করতে পারতেন না।
এই জটিলতা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালে ‘বাংলা কিউআর’ নির্দেশিকা জারি করে। এর ফলে একটিমাত্র কিউআর কোড স্ক্যান করেই গ্রাহকরা বিকাশ, রকেট, নগদ বা যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে মার্চেন্টকে টাকা পরিশোধ করতে পারছেন।
২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজস্ব কিউআরের বদলে সর্বজনীন এই ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহারের কার্যক্রম জোরদার করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেড়েছে এবং টাকার অঙ্কে তা বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।
- জুন ২০২৬: দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ১ লাখ, আর্থিক মূল্য ২৮ কোটি টাকা।
- সেপ্টেম্বর ২০২৬: দৈনিক গড় লেনদেন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
- গড় লেনদেনের পরিমাণ: জুনে প্রতিটি লেনদেনের গড় মূল্য ছিল ২,৮০০ টাকা, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,১০১ টাকায়।
কেন হঠাৎ এত জনপ্রিয় হলো?
বাংলা কিউআর জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো মার্চেন্টদের জন্য খরচ কমানো। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (MDR) বা লেনদেন ফি সম্পূর্ণ বাতিল করেছে।
আগে মার্চেন্টদের ন্যূনতম ১ শতাংশ ফি দিতে হতো। এছাড়া, আগে লেনদেনের টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হতে এক দিন সময় লাগলেও, এখন তাৎক্ষণিকভাবে মার্চেন্টের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়ে যাচ্ছে।

নভেম্বর থেকে আসছে নতুন সুবিধা
শুধু ব্যবসায়িক লেনদেন নয়, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে (Peer-to-Peer বা P2P) টাকা পাঠানোর সুবিধাও যুক্ত হচ্ছে বাংলা কিউআরে। এর ফলে একজন গ্রাহক তার বন্ধু বা আত্মীয়ের বাংলা কিউআর স্ক্যান করে বা কোডের ছবি আপলোড করে সরাসরি টাকা পাঠাতে পারবেন। এছাড়া লেনদেন ব্যর্থ (Failed Transaction) হলে দ্রুত টাকা ফেরতের ব্যবস্থাও আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, "ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেন সংরক্ষিত থাকায় অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া সহজ হবে এবং কর ফাঁকির সুযোগ কমবে। তবে ভুয়া লেনদেন দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ নেওয়া বা অর্থ পাচারের মতো ঝুঁকি ঠেকাতে নজরদারি বাড়াতে হবে।"
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, এই অগ্রগতি ধরে রাখতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্যাশলেস লেনদেনের বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। তবে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে গ্রাহকের টাকা কেটে নেওয়ার পর মার্চেন্টের হিসাবে জমা না হওয়ার মতো সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা না গেলে ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, বাংলা কিউআরের এই নীরব বিপ্লব যদি নিরবচ্ছিন্ন রাখা যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতেই বাংলাদেশ পুরোপুরি একটি ক্যাশলেস অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০২ নভেম্বর ২০২৬