প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা, তাঁর বাংলা উচ্চারণ নিয়ে মন্তব্য কিংবা মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট—গত আট মাসে এমন বিভিন্ন অভিযোগে দেশের একাধিক স্থানে আটক, গ্রেপ্তার ও মামলার ঘটনা ঘটেছে। 

কোনো ক্ষেত্রে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, কোনো ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবিরোধী বা বিশেষ ক্ষমতা আইন, আবার কাউকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব ঘটনা নতুন সরকারের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের ঘটনায় কতজন আটক বা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তার সমন্বিত সরকারি হিসাব নেই। তবে গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনায় অন্তত এক ডজন আটক বা গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়। সব ক্ষেত্রে বক্তব্য বা পোস্টের জন্য সরাসরি মামলা হয়নি, কয়েকজনকে পুরোনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ফলে অভিযোগ ও ব্যবহৃত আইনের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত ৩১ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে একটি বিতর্কিত ছবি শেয়ার করার অভিযোগে আজিজুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করা হয়। ২ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীকে ‘কটূক্তির’ অভিযোগে শাওন মাহমুদকে যুবদলের নেতা-কর্মীরা আটক করে পুলিশের কাছে দেন। 

৫ এপ্রিল ভোলায় ‘সরকারবিরোধী’ পোস্টের অভিযোগে বিবি সাওদাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়, দুই দিন পর তিনি জামিন পান। ১৭ এপ্রিল একটি ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের ঘটনায় এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর বিরুদ্ধে অনলাইন ব্ল্যাকমেইল-সংক্রান্ত ধারায় মামলা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এসব ঘটনাকে আগের সরকারের দমনমূলক চর্চার ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বাকস্বাধীনতা মানেই কাউকে নিয়ে কুৎসা-রটনা নয়। ছবি: সংগৃহীত
জাইমা রহমানকে নিয়ে পোস্টের অভিযোগেও কয়েকটি গ্রেপ্তার হয়েছে। ২৩ এপ্রিল পঞ্চগড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সম্পাদিত ছবি ও আপত্তিকর লেখা পোস্টের অভিযোগে কলেজছাত্র শাকিল আহমেদকে সাইবার সুরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। 

জুনে বাগেরহাটে এক যুবককে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৭ বছরের এক কিশোরকে পুরোনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ফেনীতেও জাইমা রহমানকে নিয়ে পোস্টের অভিযোগে মোসলেহ উদ্দিন নামের এক যুবককে সাইবার মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়।

সেপ্টেম্বরে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সমালোচনার পর গাজীপুরের কলেজছাত্র সিফাত আব্দুল্লাহকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। একই মাসে সিলেট ও মেহেরপুরে আরও দুই যুবককে আটক করে পুলিশ; তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টও গ্রেপ্তারের কারণগুলোর একটি বলে পুলিশ জানায়।

সর্বশেষ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে প্রধানমন্ত্রীর বাংলা উচ্চারণ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে মন্তব্যের অভিযোগে শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে আটক করা হয়। তিনি কটূক্তির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় প্রধানমন্ত্রীর উচ্চারণ কিছুটা অস্পষ্ট—এমন মন্তব্য করেছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ওই শিক্ষককে ছেড়ে দিয়ে পুলিশ বাড়িতে পৌঁছে দেয়। সরকার ঘটনাটিকে ভিন্নমতের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সম্মানের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা সাংবাদিকের প্রধানতম কাজ। ছবি: সংগৃহীত
সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক্‌ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, মানহানি ও অপরাধে প্ররোচনার ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধের সুযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি বলেছে, কোনো বক্তব্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের কাছে অপমানজনক মনে হওয়াই শাস্তির জন্য যথেষ্ট কারণ নয়; সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে থাকা ব্যক্তিও বৈধ সমালোচনার আওতাভুক্ত।

তবে বাক্‌স্বাধীনতা মানে যৌন হয়রানি, এআই দিয়ে অবমাননাকর ছবি তৈরি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন কিংবা সহিংসতায় উসকানির অবাধ অধিকার নয়। এসব ক্ষেত্রে আইনগত প্রতিকার প্রয়োজন। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সমালোচনা, ব্যঙ্গ, অশালীনতা ও প্রকৃত অপরাধকে একই ‘কটূক্তি’ শব্দে মিলিয়ে ফেলা হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়।

সমালোচনা সহ্য না করে দলীয় নেতা-কর্মীদের অভিযোগে দ্রুত গ্রেপ্তার, পুরোনো মামলায় আটক এবং পরে অপরাধ খোঁজার প্রবণতাকে অধিকারকর্মীরা কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। এই আশঙ্কা দূর করতে হলে বক্তব্যের জবাব বক্তব্যে দিতে হব। আর প্রকৃত অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযোগকারী, ধারা, প্রমাণ ও শাস্তির অনুপাত—সবকিছুতেই স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬