দেশে শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার চিত্র দিন দিন অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। পুলিশ স্টাফ কলেজের (পিএসসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার হওয়া প্রায় প্রতি তিন শিশুর একজনের বিরুদ্ধেই হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অপরাধে জড়িত শিশুদের মধ্যে হত্যা মামলার হার ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ।

পিএসসি জার্নালের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যায় ‘সোশিওইকোনমিক ডিটারমিন্যান্টস অব চিলড্রেন ইন কনফ্লিক্ট উইথ দ্য ল ইন বাংলাদেশ: আ ক্রিমিনোলজিক্যাল অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন পিএসসির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ও রামন চন্দ্র তালুকদার।   

গবেষণার পরিধি ও পদ্ধতি
দেশের আট বিভাগের (ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট) ১৬০টি থানার মামলা পর্যালোচনা করে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। গবেষণায় পরিমাণগত ও গুণগত উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। 

১৬০টি থানার মামলা পর্যালোচনার পাশাপাশি তিনটি সরকারি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (গাজীপুর বালক, গাজীপুর বালিকা ও যশোর বালক) থেকে ৪০৪ জন শিশু এবং তাদের ১৫৬ জন অভিভাবকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ে অতিষ্ঠ মানুষ...
বন্ধুমহলের প্রভাব ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি
কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আচরণের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব অত্যন্ত জোরালো বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অপরাধ সংঘটনের সময় ৫২ দশমিক ৯৭ শতাংশ শিশু অন্য কারো সঙ্গে ছিল। তাদের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৯২ শতাংশের সঙ্গী ছিল বন্ধু। 

এসব বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের গড় মেয়াদ ছিল আট বছর, যা প্রমাণ করে যে অপরাধের সঙ্গী বন্ধুরা সাময়িক বা ঘটনাকেন্দ্রিক নয়। এছাড়া সমবয়সীদের চাপ, মাদকের সংস্পর্শ এবং পারিবারিক নজরদারির ঘাটতিকে অপরাধের মূল ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আর্থসামাজিক অবস্থা ও পারিবারিক পটভূমি
গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধে জড়ানো শিশুদের বড় একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার থেকে এসেছে। ৪৪ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ শিশুর পরিবারে আয় ছিল ব্যয়ের তুলনায় কম, যাদের গড় মাসিক আয় ছিল ১৯ হাজার ২৭৫ টাকা। 

অন্যদিকে, ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি মামলা ছিল, যার মধ্যে ৩৪ দশমিক ৭৮ শতাংশের বিরুদ্ধেই ছিল হত্যার অভিযোগ। এছাড়া ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিশু দীর্ঘ সময় (গড়ে প্রায় ৮ ঘণ্টা) অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘরের বাইরে কাটাত।

কিশোর অপরাধ ঠেকাতে না পারলে চরম মূল্য দিতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে ...
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সুপারিশসুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শিশুদের এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত, যা মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কাউন্সেলিং ও পারিবারিক তত্ত্বাবধান বাড়াতে হবে। 

শিশু সুরক্ষা কর্মী বিজন চৌধুরী বুনিয়াদি শিক্ষার সুযোগহীনতা ও হতদরিদ্র শিশুদের শ্রমে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তাদের পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। 

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক আসামির মতো জিজ্ঞাসাবাদ না করার আহ্বান জানিয়ে তাদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন।   

পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের প্রতিটি থানায় শিশুদের জন্য বিশেষ ডেস্ক রয়েছে এবং আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শিশু অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়; এর জন্য রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১২ অক্টোবর ২০২৬