‘সিস্টার’দের দলত্যাগ
- জামায়াত-সঙ্গ আর নারী অবমূল্যায়ন: এনসিপিতে একে একে নিভছে ‘সিস্টার’দের আলো
- পদত্যাগ আর পদাবনতির ডামাডোল: জামায়াতের ছায়ায় আদর্শ হারাচ্ছে এনসিপি, দীর্ঘ হচ্ছে দলছুটদের তালিকা
➤ জুলাই অভ্যুত্থানের রূপকার হিসেবে রাজনীতির মাঠে আবির্ভূত হওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে একে একে ছিটকে পড়ছেন দলের শীর্ষ নারী নেত্রীরা, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সিস্টার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
তাজনূভা জাবীন ও তাসনিম জারার পর এবার দল ছাড়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তারা সবাই দলের ‘জামায়াত-সঙ্গ’ এবং ‘নারীদের প্রতি অবমূল্যায়ন’-কেই প্রধানত দায়ী করেছেন।
সামান্তার পদত্যাগ ও ক্ষোভের কারণ
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থী সামান্তা শারমিন। এনসিপি গঠনের শুরু থেকেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের পদে ছিলেন।
কিন্তু গত ২৩ অক্টোবর কোনো ধরনের কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠন করে তাকে পদাবনতি দিয়ে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় এবং তার জায়গায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আব্দুল্লাহকে বসানো হয়। এই অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় তিনি দল ছাড়ার ঘোষণা দিলেন।
দীর্ঘ বিবৃতিতে সামান্তা বলেন, "গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা হলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুরনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো নারীদের রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায্য হিস্যা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এনসিপিও সেই পথে হাঁটছে।"

জামায়াত ফ্যাক্টর এবং এনসিপির আদর্শচ্যুতি
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা যখন এনসিপি গঠন করেন, তখন অনেকেই একে জামায়াতে ইসলামীর ‘বি’ টিম বলে সমালোচনা করেছিলেন। যদিও দলটির নেতারা শুরুতে নিজেদের আলাদা প্রগতিশীল শক্তি হিসেবে দাবি করেছিলেন।
কিন্তু নির্বাচনের আগে এনসিপি যখন জামায়াতের সঙ্গে ১১ দলীয় জোটে যোগ দেয়, তখনই দলের ভেতরের আদর্শিক দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে।
গত ডিসেম্বরে তাজনূভা জাবীন ও তাসনিম জারা যখন দল ছাড়েন, তখন তাজনূভা স্পষ্ট অভিযোগ করেছিলেন, "এনসিপি যে জামায়াতের সঙ্গে জোট করবে, তা আগেই ঠিক করা ছিল; পুরো জুলাই আন্দোলনকে রাজনৈতিক কৌশলের নাম করে জামায়াতের হাতে তুলে দিচ্ছে এনসিপি।"
একই সুর সামান্তার কণ্ঠেও। তিনি বলেন, "জামায়াতের সঙ্গে জোট করে এনসিপি সংস্কারের রাজনীতি থেকে সরে গেছে। জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন গণতান্ত্রিক নয়। তারা কেবল অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করার জন্যই সংস্কারের কথা বলছে।"
দীর্ঘ হচ্ছে দলত্যাগের তালিকা
জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার পর মাত্র ১১ দিনের মধ্যে অন্তত ১৬ জন কেন্দ্রীয় নেতা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন। তাদের মধ্যে মীর আরশাদুল হক, খালেদ সাইফুল্লাহ, মুশফিক উস সালেহীন, খান মুহাম্মদ মুরসালীন এবং আরিফ সোহেলের মতো শীর্ষ নেতারাও ছিলেন।
এখন সেই তালিকায় যুক্ত হলো সামান্তা শারমিনের নাম। এনসিপি ছেড়ে যাওয়া বামপন্থিদের একটি অংশ ইতিমধ্যে ‘এনপিএ’ নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছে।
দলের ভেতরে নারীদের অধিকার নিয়ে আপত্তি তোলা ছয় ‘সিস্টার’-এর মধ্যে বর্তমানে মনিরা শারমিন এবং নুসরাত তাবাসসুম দলেই রয়ে গেছেন এবং দলের হয়ে নারী আসনের সংসদ সদস্যও হয়েছেন।
এছাড়া কমিটিতে মাহমুদা আলম মিতু, দিলশানা পারুল ও এ কে ফ্লোরা যুগ্ম আহ্বায়কের পদে রয়েছেন। তবে নারী নেতৃত্বের এত বড় অংশ দল ছাড়ায় এনসিপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ এবং তাদের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ভাবমূর্তি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০৬ নভেম্বর ২০২৬