➤ বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা বনাম দাতা সংস্থার পূর্বাভাস: জিডিপি ও মূল্যস্ফীতিতে আকাশ-পাতাল ফারাক

  • অর্থনীতিতে শঙ্কার মেঘ: প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সরকারি লক্ষ্যের ধারেকাছেও নেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক
  • দাতা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে উদ্বেগ: কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া লক্ষ্য অর্জন ‘অসম্ভব’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা

➤ চলতি অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে সরকার যে আশাবাদী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসের বিশাল ব্যবধান দেখা দিয়েছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দুই সূচকে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রাক্কলনের বিস্তর ফারাক বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। 

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বাজার ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির এই বহুমুখী চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন।

প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতিতে আকাশ-পাতাল ব্যবধান 

সরকারের নির্ধারিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস এর ধারেকাছেও নেই। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলছে প্রবৃদ্ধি হতে পারে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের মতে, ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস সবচেয়ে হতাশাজনক—মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, সরকারি লক্ষ্যের চেয়ে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কম।

অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ (৭.৫) শতাংশে নামিয়ে আনার সরকারি লক্ষ্যের বিপরীতে দাতা সংস্থাগুলো দিচ্ছে ভয়াবহ বার্তা। আইএমএফের পূর্বাভাস বলছে, মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এডিবির পূর্বাভাস ৯ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাংকের ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এর সহজ অর্থ হলো, নিত্যপণ্যের অসহনীয় দামে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ কমার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই।

যে কারণে অর্থনীতিতে স্থবিরতা 

অর্থনীতিবিদ ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বর্তমান অর্থনীতির শঙ্কার জায়গাগুলো চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের চরম স্থবিরতা, ব্যাংক ঋণের লাগামহীন উচ্চ সুদহার, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে অর্থনীতিকে এক জটিল সমীকরণের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সংকট উত্তরণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে শুধু সুদের হার বাড়ানো বা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ। তার মতে, মুদ্রানীতির পাশাপাশি বাজারে পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।

অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে বিশেষজ্ঞরা সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছেন:

  • ব্যয় সংকোচন ও রাজস্ব বৃদ্ধি: অনুৎপাদনশীল ও অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কঠোরভাবে কমানো এবং রাজস্ব আদায়ের আওতা বাড়ানো।
  • সামাজিক সুরক্ষা: নিম্ন আয়ের মানুষকে মূল্যস্ফীতির কশাঘাত থেকে বাঁচাতে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী (Social Safety Net) দ্রুত সম্প্রসারণ করা।
  • ব্যাংক খাতে সুশাসন: ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং পাহাড়সম খেলাপি ঋণ কঠোর হস্তে মোকাবিলা করা।
  • বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন: জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফেরাতে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির এই ভঙ্গুর দশা থেকে রাতারাতি উত্তরণ সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে, কার্যকর ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এবং প্রবৃদ্ধির চাকা সচল করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ◉

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ ২৬ অক্টোবর ২০২৬