প্যারিসের রাজপথ থেকে শুরু করে রোম, এথেন্স, মাদ্রিদ কিংবা লিসবন—গোটা ইউরোপ এখন বিক্ষোভের আগুনে উত্তাল। আর এই নজিরবিহীন প্রতিবাদের একেবারে সামনের সারিতে রয়েছে জেনারেশন জেড বা সংক্ষেপে ‘জেন-জি’।

কোথাও অতিরিক্ত খরচে নিম্নমানের শিক্ষা, কোথাও তীব্র আবাসন সংকট, আবার কোথাও জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ এই তরুণেরা। কারণগুলো দেশভেদে ভিন্ন হলেও, প্রতিটি বিক্ষোভের মূলে রয়েছে এক অভিন্ন হতাশা—পূর্ববর্তী প্রজন্মের পাওয়া সুযোগ-সুবিধা থেকে বর্তমান প্রজন্মের বঞ্চিত হওয়ার ভয়।

শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা ও আবাসন সংকট
ইউরোপীয় জেন-জিদের ক্ষোভের সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হলো—শিক্ষা ও আবাসন খাতের চরম সংকট। ফ্রান্সে বিক্ষোভের সূত্রপাত শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। শিক্ষক সংকট, বিদ্যালয়গুলোর জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে তারা। 

ফরাসি শিক্ষার্থী সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ব্রিতো জানান, "আমাদের দাবিগুলো অভিন্ন। আমরা শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবি জানাচ্ছি।"

অন্যদিকে, স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা মারিকারমেন অ্যাবাসকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের একটি ছোট ঘটনা দেশটিতে চলমান আবাসন সংকটের ক্ষোভে যেন ঘি ঢেলে দিয়েছে। স্পেনের এই বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়েছে প্রতিবেশী পর্তুগালেও। 

লিসবনের রোসিও চত্বরে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান নিয়েছে হাজারো মানুষ। তাদের হাতে থাকা পতাকায় লেখা, ‘কাসাস পারা মোরার’ বা ‘বসবাসের জন্য বাড়ি চাই’।

ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়েছে জেন-জি বিদ্রোহ
ইতালির অবস্থাও ব্যতিক্রম নয়। ইতালীয় ছাত্রনেতা সাবরিনা ব্রিজোলা বলেন, "আমরা এমন বিদ্যালয় চাই, যার ছাদ ধসে আমাদের মাথায় পড়বে না। আমরা নিরাপদ কাজ, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা আর সামাজিক ন্যায়বিচার চাই।" যদিও ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা দাবি করেছেন, তাদের পরিস্থিতি ফ্রান্সের মতো নয়; তবুও রোমের বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা ‘ফ্রান্সের মতো’ স্লোগান দিয়েই রাজপথ কাঁপাচ্ছে।

ভাঙছে উদার গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি
ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপনডেন্ট’-এর প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিন্টেলমানের মতে, এই বিক্ষোভগুলোর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে। তিনি বলেন, "মৌলিকভাবে আমরা দেখছি, উদার গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি ভেঙে পড়ছে।

প্রতিশ্রুতি ছিল—পরবর্তী প্রজন্ম বর্তমানের চেয়ে ভালো জীবন পাবে। কিন্তু এখন আর তা সত্য বলে মনে হচ্ছে না।" এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ার ভয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের উদ্বেগ তরুণদের আরও হতাশ করে তুলেছে।

জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধের প্রভাব
ইরানে চলমান যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়েই জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইউরোপের অর্থনীতিতে। জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে ইতালিতে ট্রাকচালকেরাও বিক্ষোভে নেমেছেন। তাদের অবরোধের কারণে দেশটিতে বিখ্যাত মোজারেলা পনির এবং পাস্তা উৎপাদন পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক এই দুরবস্থার কারণে ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস ও স্পেনের মতো বেশি জাতীয় ঋণ থাকা দেশগুলোর পক্ষে নতুন করে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এশিয়ায় উত্থান জেনি-জিদের কোথায় গিয়ে থামবে কেউ জানে না ...
দুর্নীতি ও সরকার পতনের ডাক
বলকান অঞ্চলে এই বিক্ষোভ কেবল অধিকার আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা রূপ নিয়েছে সরকার পতনের আন্দোলনে। আলবেনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের জড়িত থাকা একটি বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হয়। এখন সেই বিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী এদি রামের পদত্যাগের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে সার্বিয়াতেও গত দুই বছর ধরে চলা শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুসিচের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সীমানা ছাড়িয়ে সংহতি ও আসন্ন ধর্মঘট
এক দেশের জেন-জিদের বিক্ষোভ অন্য দেশের তরুণদের রাজপথে নামতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে কৌশল ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইউরোপজুড়ে বৃহৎ পরিসরে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে।

জার্মানিতে ‘জেন-জেড রেগেল্ট’ নামের একটি সংগঠন ৩১ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। ফ্রান্স ও স্পেনের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো যথাক্রমে ৫ ও ১১ নভেম্বর ধর্মঘট পালন করবে। এছাড়া, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ২০ নভেম্বর একযোগে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে ইতালি ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো।

জেন-জিদের এই মহাবিস্ফোরিত ক্ষোভ ইউরোপের সরকারগুলোর জন্য এক স্পষ্ট বার্তা—ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে, এই বিক্ষোভের আগুন সহজে নিভবে না।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ জেডআরসি/ ২৫ অক্টোবর ২০২৬