ঢাকা: ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগালসহ ইউরোপের একাধিক দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও আবাসন সংকটের জেরে ছড়িয়ে পড়া গণবিক্ষোভ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন বিপদের সংকেত দিচ্ছে। অঞ্চলটির অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমার আশঙ্কায় এরই মধ্যে ক্রয়াদেশ স্থগিত করতে শুরু করেছেন অনেক ক্রেতা।

বৈশ্বিক এই ধাক্কার পাশাপাশি সুতা আমদানিতে সরকারের নতুন বিধিনিষেধ, আসন্ন মজুরি বৃদ্ধির চাপ এবং গ্যাস সংকটের মতো অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জে চড়েছে উৎপাদন ব্যয়। ফলে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় বাজারটিতে তীব্র অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

ইউরোপের অস্থিরতা ও বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশ
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের পোশাকের বৃহত্তম বাজার; দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশই যায় সেখানে। 

কিন্তু ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ২৯ শতাংশ কমেছে। অথচ একই সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে রেকর্ড ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

ইউরোপীয় কমিশনের পূর্বাভাস মতে, ২০২৬ সালে ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ১ দশমিক ১ শতাংশে (যা ২০২৫ সালে ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ)। মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

বৈশ্বিক এই ধাক্কার পাশাপাশি সুতা আমদানিতে সরকারের নতুন বিধিনিষেধ
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি এবং ফতুল্লা ফ্যাশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে শামীম এহসান জানান, ফ্রান্সের দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভের কারণে অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কায় এক ফরাসি ক্রেতা তাদের চূড়ান্ত হওয়া ক্রয়াদেশ আপাতত স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।

ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার ও উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফ মনে করছেন, ইউরোপে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাজার হিস্যা ধরে রাখা কঠিন হবে। অন্যদিকে স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম মনে করেন, বিক্ষোভের চেয়েও মূল কারণ সেখানকার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দা, যার ফলে মার্কিন ও ইউরোপীয়—উভয় বাজারেই চাহিদা কমছে।

সুতা আমদানির বিধিনিষেধ: ‘অশুল্ক বাধা’র অভিযোগ
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম কমানোর তীব্র চাপ, তখন দেশীয় নীতিগত সিদ্ধান্তে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ছে। স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলোকে সুরক্ষা দিতে সরকার সম্প্রতি নিট পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। নতুন নিয়মে সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিয়ে সুতা ছাড়াতে হচ্ছে, যা রপ্তানিকারকদের মতে এক ধরনের ‘অশুল্ক বাধা’।

ফকির ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ জানান, আমদানি করা প্রতি কেজি ৩০ কাউন্টের কম্বড সুতার দাম যেখানে ৩ দশমিক ১৫ ডলার, সেখানে স্থানীয় বাজারে একই সুতার দাম ৩ দশমিক ৭৫ ডলার। 

ফলে বাধ্য হয়ে স্থানীয় সুতা ব্যবহার করলে প্রতি পিস পোশাকে উৎপাদন খরচ বাড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ১৫ ডলার। কিন্তু ইউরোপের ক্রেতারা এক সেন্ট বাড়তি দাম দিতেও নারাজ; উল্টো তারা দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন।

প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি
উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলছেন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) থাকায় অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট, স্থানীয় সুতার উচ্চমূল্য এবং শিগগিরই কার্যকর হতে যাওয়া সম্ভাব্য নতুন মজুরি কাঠামোর কারণে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে।

ফকির কামরুজ্জামান নাহিদের মতে, আগামী এক মাস তৈরি পোশাক খাতের জন্য অত্যন্ত সংকটময়। এই সময়ের মধ্যে সুতা আমদানির বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা না হলে বাংলাদেশে আসার পাইপলাইনে থাকা ক্রয়াদেশগুলো সরাসরি ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানে চলে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।

বিশ্ববাজারের মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত জটিলতার এই যুগপৎ অভিঘাত সামাল দিতে না পারলে শুধু কারখানার চাকা নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল স্তম্ভটিও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ২১ অক্টোবর ২০২৬