দ্রুত সবুজায়নের আশায় রোপণ করা এই বিদেশি গাছ এখন তীব্র পানির সংকট, ভূমিধস ও কৃষিজমি উর্বরতা হ্রাসের কারণ; দেশীয় গাছ ফিরিয়ে আনার জোরালো তাগিদ

➤ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুপাশের সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই উপজেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এক অনন্য অঞ্চল। পাহাড় ও সমতলের এই মেলবন্ধন এলাকায় একসময় দ্রুত সবুজায়ন কিংবা লাভজনক কাঠ উৎপাদনের আশায় পাহাড়ের পাদদেশে, রেললাইনের পাশে এবং মহাসড়কের দুই ধারে বিপুলসংখ্যক ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো হয়েছিল। 

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দ্রুতবর্ধনশীল এই বিদেশি প্রজাতির গাছ এখন পরিবেশ, প্রকৃতি ও স্থানীয় মানুষের জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পানির সংকট ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক আঘাত

পরিবেশবিদদের গবেষণায় ইউক্যালিপটাস গাছের বহু ক্ষতিকর দিক উঠে এসেছে। পাহাড়ি ও সমতল এই অঞ্চলে প্রচুর পানি শোষণকারী গাছ হিসেবে ইউক্যালিপটাস মাটি থেকে বিপুল পরিমাণ পানি শুষে নেয়। ফলে দ্রুত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং এলাকায় তীব্র সুপেয় পানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

পাশাপাশি, এই গাছের পাতার তীব্র গন্ধের কারণে পাখি ও মৌমাছিরা সেখানে বাসা বাঁধতে আগ্রহ দেখায় না। এর ফলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ের ঢালে ইউক্যালিপটাস গাছের শিকড় মাটিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে রাখতে না পারায় ভারী বৃষ্টিপাতের সময় ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।

এই বিদেশি প্রজাতির গাছ এখন পরিবেশ, প্রকৃতি ও স্থানীয় মানুষের জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি ও কাঠের অসারতা

পরিবেশগত ক্ষতির পাশাপাশি এই গাছ লাগিয়ে স্থানীয় কৃষক ও জমির মালিকরাও দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ইউক্যালিপটাসের শিকড় চারদিকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের জমি থেকে আর্দ্রতা ও পুষ্টি উপাদান শুষে নেয়। এর ফলে জমির উর্বরতা কমে যাওয়ায় ধান ও শাকসবজির কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।

তাছাড়া, ইউক্যালিপটাসের কাঠ নরম ও ভঙ্গুর হওয়ায় তা আসবাবপত্র কিংবা ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য উপযুক্ত নয়। বাজারে দেশীয় মেহগনি বা রেইনট্রির কাঠের তুলনায় এর চাহিদা ও দাম অনেক কম থাকায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

করণীয়: দেশীয় বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ভারসাম্য পুনরুদ্ধার

যে গাছকে একসময় দ্রুত সবুজায়নের সহজ সমাধান হিসেবে দেখা হয়েছিল, তা আজ মাটির পানিসম্পদ নিঃশেষ করেছে এবং কৃষকদের বিনিয়োগের বিপরীতে সামান্যই সুফল দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলা এবং সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই অঞ্চলের পরিবেশ ও কৃষি রক্ষা করতে এখন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাসড়কের পাশের এবং কৃষিজমির আইলে থাকা ইউক্যালিপটাস গাছগুলো পর্যায়ক্রমে কেটে ফেলে সেখানে আম, জাম, কাঁঠাল, অর্জুন, মেহগনি ও কদমের মতো দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে। এর মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। 

একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের উদ্যোগে জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। সাময়িক লাভের লোভে ইউক্যালিপটাস চাষের বিস্তার যে আত্মবিনাশী সিদ্ধান্ত ছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে দেশীয় বৃক্ষসম্পদ গড়ে তোলাই এখন সময়ের প্রধান দাবি। ◉

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬