ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করাই ‘প্রধান লক্ষ্য’ বলে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষক ও কৌশলবিদরা মনে করছেন, সামরিক হামলা চালিয়ে ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করার সক্ষমতা ইসরায়েলের থাকলেও, একটি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো সম্পূর্ণ ভিন্ন ও কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, স্থল অভিযানের প্রস্তুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সমর্থন ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কার্যত অসম্ভব বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত ১৮ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা এবং পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথের ইসরায়েল সফরের পর নেতানিয়াহু তার এই লক্ষ্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে ইরানে নতুন করে সরাসরি হামলা বা সরকার পরিবর্তনের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সম্মতি দিয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত দেননি।
ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ও স্থল অভিযানের বাধ্যবাধকতা
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) গবেষক আরবান কনিংহাম আল জাজিরাকে জানান, বিপুল পরিমাণ আক্রমণাত্মক অস্ত্র এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা থাকায় ইসরায়েল অনায়াসেই ইরানের আকাশে আধিপত্য বিস্তার করে বোমাবর্ষণ করতে পারে। কিন্তু শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে সরকার পতন যে সম্ভব নয়, তা গত মার্চে নেতানিয়াহু নিজেও স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “এর পাশাপাশি স্থল অভিযানও থাকতে হবে।”
তুরস্কের আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক চাগলার কুরচ বলেন, ‘বিমান হামলায় সামরিক সক্ষমতা কমানো যায়, কিন্তু সম্পূর্ণ ধ্বংস করা যায় না। ইরানের সুনিপুণভাবে লুকিয়ে রাখা ভূগর্ভস্থ সামরিক ব্যবস্থা টিকে থাকবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, একটি দেশের সরকার পতন ঘটাতে হলে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সেনা মোতায়েন ও বছরের পর বছর অবস্থান করার প্রস্তুতি থাকতে হবে, যা ইসরায়েলের নেই।
গোপন অভিযান ও সাইবার হামলার সীমাবদ্ধতা
ইসরায়েল সাধারণত ইরানের অভ্যন্তরে গুপ্তহত্যা, গোপন নেটওয়ার্ক এবং সাইবার হামলার ওপর বেশি নির্ভরশীল। তবে গবেষক কনিংহামের মতে, এই কৌশলগুলো ‘ইউজ অ্যান্ড বার্ন’ অর্থাৎ একবার ব্যবহার করলে পরবর্তীতে আর কাজ করে না। কারণ, এসব নেটওয়ার্কের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে। এছাড়া কুর্দি বা বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দিয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মতো শক্তিশালী বাহিনীকে মোকাবিলার চিন্তাও সামরিকভাবে অবাস্তব।

দুই দফা হামলা মোকাবিলার পর ইরান এখনো শক্তিশালী পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। রুসির জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল জানান, ইরানের লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ক্ষতি হলেও তাদের কাছে এখনো বিপুল পরিমাণ জাহাজবিধ্বংসী ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়গুলো প্রাকৃতিক বাঙ্কার হিসেবে কাজ করে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অসম যুদ্ধের অর্থনীতি। ইরানের ড্রোন ও মিসাইল তৈরি করতে খরচ ও সময় অনেক কম লাগে। অন্যদিকে, এগুলো প্রতিহত করতে ইসরায়েলকে ব্যবহার করতে হয় অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র। দীর্ঘমেয়াদি পাল্টাপাল্টি হামলা চললে ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টরের মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে, যার ফলে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও বাংকারবিধ্বংসী বোমার অভাব
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন করে উত্তেজনা না বাড়ানোর চাপে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের নতুন করে হামলার প্রস্তাবে ট্রাম্প এখনো অনুমোদন দেননি।
যুক্তরাষ্ট্র যদি এই যুদ্ধে না জড়ায়, তবে ইসরায়েল সবচেয়ে বড় যে সামরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে তা হলো—৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৫৭ বাংকারবিধ্বংসী বোমা। মাটির গভীরে থাকা পারমাণবিক স্থাপনা বা সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করার এই একক সক্ষমতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরই আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া ইসরায়েল যদি একাই হামলা চালায়, তবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে হামলা না চালিয়ে কেবল ইসরায়েলের ভূখণ্ডেই সর্বাত্মক হামলা চালাতে পারে। গাজায় চলমান আগ্রাসনের কারণে এমনিতেই আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা ইসরায়েলের জন্য এটি এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করবে।
অধ্যাপক চাগলার কুরচের ভাষায়, “ইসরায়েল একা ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রও সরকার পরিবর্তনের আরেকটি অভিযানে জড়াবে না, কারণ এ ধরনের অভিযান কয়েক দশক ধরে চলতে পারে।” ফলে নেতানিয়াহুর সরকার পরিবর্তনের ঘোষণা আপাতত একটি রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছুই নয়।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ২৪ অক্টোবর ২০২৬