খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও পিটিআই সরকার স্থগিত: সন্ত্রাসবাদের অজুহাতে রাজনৈতিক দমনপীড়ন তীব্র; অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বহুমুখী ভূরাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান রাজনৈতিক ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং সেখানকার প্রাদেশিক সরকারকে স্থগিত করার ঘটনায় দেশটির রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। 

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, কেন্দ্রের এই কঠোর পদক্ষেপ হিতে বিপরীত হতে পারে এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে এক বিপজ্জনক মোড়ে নিয়ে যেতে পারে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার রাজধানী পেশোয়ারে বর্তমানে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রেড জোন এলাকায় যাতায়াত বন্ধ রাখতে রাস্তার ওপর বসানো হয়েছে ভারী কনটেইনার, বন্ধ রাখা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আংশিক স্থগিত রয়েছে ইন্টারনেট সেবা। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে টহল দিচ্ছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। গত ১৩ বছর ধরে এই প্রদেশে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ধরে রেখেছে পিটিআই।

সন্ত্রাসবাদের অজুহাত বনাম রাজনৈতিক দমনপীড়ন

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি এবং পিটিআই সরকার স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ সংবিধানসম্মত এবং এর মূল উদ্দেশ্য সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলা করা। 

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার অভিযোগ করেছেন, পিটিআই নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছিল। তবে এই দাবির সপক্ষে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ বা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে পারেনি সরকার।

এর রাজনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করবে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের মতে, সরকারের এই যুক্তির পেছনে মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন। গত ৪ অক্টোবর থেকে কারাবন্দী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির নেতৃত্বে ইসলামাবাদ অভিমুখে পিটিআইয়ের বিশাল লংমার্চ শুরু হয়েছিল। 

এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই মূলত কেন্দ্র সরকার পিটিআইকে দমন করতে এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার দাবি করছে মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে ‘নিরাপত্তামূলক হেফাজতে’ রাখা হয়েছে, যদিও পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে তাকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা: ‘আগুন নিয়ে খেলা’

লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের সহযোগী গবেষক ফারজানা শেখ মনে করেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন সম্পর্ক ভালো থাকায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিক1 পালনের সুবাদে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিজেদের বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে করছে। তবে খাইবার পাখতুনখাওয়ার সরকারের ওপর কেন্দ্রের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান সতর্ক করে বলেছেন, “এটি আগুন নিয়ে খেলার শামিল। এই সিদ্ধান্তের ফলে জনগণের ক্ষোভ ও অসন্তোষ যেভাবে তীব্র আকার ধারণ করবে, তাতে সরকারকে বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।”

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরিফা নূর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রিত কোনো প্রাদেশিক সরকারকে মেনে না নেওয়ার মানসিকতাই এই সংঘাতকে একটি অনিবার্য ট্রেন দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হোসেনও এমন সিদ্ধান্তকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছেন।

পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ ও ভূরাজনৈতিক চাপ

পাকিস্তানের সামনে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বহুবিধ সংকট রয়েছে। ২০২৬ সালের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসবাদে আক্রান্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তান। এর পাশাপাশি আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বৈরিতা তো রয়েছেই।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক নীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। চলতি বছরের আগস্টে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি সংঘাতের বিষয়টি ইসলামাবাদের জন্য নতুন মাথাব্যথা তৈরি করেছে। 

দেশের নিরাপত্তা যখন নানা প্রান্তে বিভক্ত, ঠিক সেই সময়ে নিজ দেশের একটি প্রধান প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করে কেন্দ্র সরকার প্রশাসন পরিচালনার পুরো দায় নিজের কাঁধে তুলে নিল—যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির জন্য বড় ধরনের বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬