সামরিক ক্ষমতা থাকা আর সেই ক্ষমতাকে রাজনৈতিক বিজয়ে রূপান্তর করা—দুটি যে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, তা ওয়াশিংটনকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে ইতিহাস। ২২ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালির দিকে তাকালেই এই রূঢ় বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি যে পথ দিয়ে পারাপার হতো, সেদিন সেখানে মাত্র দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ পাড়ি দিয়েছে।
প্রণালিতে বিলিয়ন ডলারের মার্কিন যুদ্ধজাহাজ টহল দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু জাহাজের মালিক বা বিমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। এর অর্থ পরিষ্কার: সামরিক শক্তি দিয়ে আপনি সাগরে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেন, কিন্তু অর্থনীতি বা বাজারকে নিজের শর্ত মানতে বাধ্য করতে পারেন না। সামি আল-আরিয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতির নাম দেওয়া যায় ‘হরমুজ সিনড্রোম’।
সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বনাম রাজনৈতিক লক্ষ্য
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ আজ সাত মাসে গড়িয়েছে। পেন্টাগনের হিসাব বলছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতেই এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে; যার ২৮ বিলিয়নই উড়ে গেছে শুধু উন্নত ইন্টারসেপ্টর আর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার পেছনে। যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং আহত হয়েছেন ৮৩০ জনের বেশি। প্যাট্রিয়ট, থাড ও টমাহক মিসাইলের মজুত তলানিতে নেমে আসার সতর্কবার্তাও রয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম ৩৯ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের অনুপ্রবেশ এবং সিরিয়া-লেবাননে মিত্রদের পতনের কারণে ইরান কৌশলগতভাবে দুর্বল অবস্থায় যুদ্ধ শুরু করলেও, তারা আত্মসমর্পণ করেনি। উল্টো সস্তা ড্রোন দিয়ে তারা ওয়াশিংটনকে মিলিয়ন ডলারের মিসাইল ছুড়তে বাধ্য করছে। এটি অসম যুদ্ধের এক ধ্রুপদী অর্থনীতি—যেখানে শত্রুকে ধ্বংস করার চেয়ে শত্রুর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও সামরিক নাভিশ্বাস তোলাই মূল লক্ষ্য।
ভিয়েতনামের ভূত এবং উপসাগরীয় যুদ্ধের মোহ
এই দৃশ্যপট অনিবার্যভাবেই ভিয়েতনামের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তি, বিপুল বোমাবর্ষণ আর ৫ লাখ সেনা মোতায়েন থাকার পরও ওয়াশিংটন তার রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল।
১৯৭৫ সালে সায়গনের পতন মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের মনে যে ‘ভিয়েতনাম সিনড্রোম’ তৈরি করেছিল, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ তাকে ভুলিয়ে দেয়। সেই যুদ্ধে প্রায় ২ হাজার মার্কিন ও ৬০০ মিত্র বিমানের এক লাখের বেশি উড্ডয়ন এবং ১০০ ঘণ্টার স্থল অভিযানে কুয়েত মুক্ত হয়। মার্কিন প্রাণহানি ছিল ৩০০-এর কম।

২০০১ সালের পর আফগানিস্তান ও ইরাকে ট্রিলিয়ন ডলার খরচের পরও যখন তালেবান কাবুলে ফিরল এবং বাগদাদে ইরানের প্রভাব বাড়ল, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে ওই ধারণা কতটা ভ্রান্ত ছিল।
বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থা এবং নতুন জোট
১৯৯১ সালের সেই একক পরাশক্তির বিশ্ব এখন আর নেই। গাজার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বারবার ভেটো প্রয়োগ গ্লোবাল সাউথের কাছে তাদের ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ উন্মোচন করেছে।
চীন এখন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক মেরু, রাশিয়া পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে, আর ভারত, ব্রাজিল বা তুরস্কের মতো মধ্যম শক্তিগুলো কোনো একক পরাশক্তির তাঁবেদারি না করে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী বহু-পক্ষীয় কূটনীতি চালাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ভেতরেই। গত ৭ আগস্ট তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ প্রমাণ করে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আর কেবল মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না।
এপ্রিলে হরমুজে নৌ অবরোধ, জুনে ক্ষণস্থায়ী সমঝোতা এবং জুলাইয়ে পুনরায় অবরোধ বহালের পরও ইরানকে নতি স্বীকার করানো যায়নি। উল্টো যুদ্ধপূর্ব দৈনিক ১২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল নেমে এসেছে কার্যত শূন্যের কোঠায়।
যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি হিসেবে শেষ হয়ে গেছে—এমন সরল উপসংহার টানার সুযোগ নেই। সামরিক সক্ষমতায় তারা এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং ইরানও এই সংঘাতে চরম মূল্য দিচ্ছে। কিন্তু ২১ মাইলের সরু হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সামনে একটি নগ্ন সত্য তুলে ধরেছে।
শত শত যুদ্ধবিমান আর রণতরীর বহর দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো যায়, কিন্তু প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ভিয়েতনাম ওয়াশিংটনকে যা শিখিয়েছিল, হরমুজ আজ নতুন করে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—সর্বাধিনায়ক হওয়া মানেই সব শর্ত নিজের পক্ষে লিখতে পারা নয়।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬