পুরান ঢাকার বাসিন্দা রিয়াদ ও শাহনাজের (ছদ্মনাম) পাঁচ বছরের প্রেম পরিণতি পেয়েছিল ২০১৭ সালের বিয়েতে। ২০২১ সালে তাদের ঘরে একটি কন্যাসন্তান এলেও, ততদিনে স্বামী-স্ত্রীর বোঝাপড়ায় ফাটল ধরেছে। সন্দেহ, মানসিক দূরত্ব ও নিয়মিত খিটিমিটির জেরে আট বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৫ সালে বিচ্ছেদের পথে হাঁটেন তারা। 

বর্তমানে শাহনাজ মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকেন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। রিয়াদ নতুন করে বিয়ে করলেও সন্তানের কোনো খোঁজ বা খোরপোশ দেন না।

শুধু রিয়াদ-শাহনাজ নয়, খিলগাঁওয়ের আরিফ-নাজমা দম্পতির মতো হাজারো যুগল একই ছাদের নিচে থেকেও মানসিকভাবে দূরে সরে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের কাগজ হাতে নিচ্ছেন। আধুনিক নগরজীবনে ‘মনের অমিল’ বা ‘দাম্পত্য কলহ’-এর মতো শব্দের আড়ালে নীরবে ভেঙে যাচ্ছে হাজারো সাজানো সংসার।

পরিসংখ্যানের ভয়ংকর চিত্র: ঘণ্টায় দুটি বিচ্ছেদ
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৪৪টি সংসার ভাঙছে, অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় দুটি করে বিচ্ছেদ কার্যকর হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৭,৫১৪টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় জুন পর্যন্ত ২,৮৫১টি তালাক কার্যকর হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, উত্তরের তুলনায় দক্ষিণে তালাকের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি, যেখানে গড়ে প্রতিদিন ২৮টি সংসার ভাঙছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তালাকের নোটিশ পাঠানোর পর আপস বা পুনর্মিলনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। উত্তরের পরিসংখ্যান বলছে, আবেদনের পর মাত্র ৫.৮৭ শতাংশ ক্ষেত্রে দম্পতিরা আপস করেছেন।

তালাক প্রদানে দ্বিগুণের বেশি এগিয়ে নারীরা
বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে পুরুষদের তুলনায় নারীরা এখন স্পষ্টভাবে এগিয়ে। দুই সিটির মোট ৪৩,২৬৬টি তালাকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পুরুষদের পক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে ১৩,৯৬৮টি। বিপরীতে নারীদের পক্ষ থেকে নোটিশ এসেছে ২৯,২৯৮টি, যা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১০৯.৬ শতাংশ বা ২.১ গুণ বেশি।

তথ্যচিত্রটি কালের কণ্ঠ থেকে সংগৃহীত
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এর অন্যতম প্রধান কারণ। অতীতে অনেক নারী পারিবারিক নির্যাতন ও অবহেলা সহ্য করেও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে সংসার আঁকড়ে থাকতেন। কিন্তু এখন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসায় নারীরা দীর্ঘদিনের অসম্মান ও নির্যাতন মেনে নিয়ে সংসার করতে রাজি নন। এটি একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেয়।

নেপথ্যের ১২ কারণ
তালাকের নোটিশে সাধারণত ‘মনের অমিল’ বা ‘যৌথ সিদ্ধান্তে মতানৈক্য’ উল্লেখ করা হলেও, এর গভীরে রয়েছে অন্তত ১২টি সুনির্দিষ্ট কারণ। এর মধ্যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌতুক, পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, মাদকাসক্তি এবং অর্থনৈতিক চাপ সবচেয়ে বেশি দায়ী।

এছাড়া স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের (ফেসবুক, মেসেঞ্জার) অতিরিক্ত ব্যবহার এবং এর ফলে সৃষ্ট সন্দেহ-অবিশ্বাসও বহু সংসার ভাঙার অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। কর্মজীবী স্বামী-স্ত্রীর একে অপরকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং যোগাযোগের ঘাটতিও বিচ্ছেদের পথ প্রশস্ত করছে।

সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সন্তানরা
একটি বিবাহবিচ্ছেদের সবচেয়ে করুণ পরিণতি ভোগ করে নির্দোষ সন্তানরা। মা-বাবার বিচ্ছেদের পর তাদের মানসিক নিরাপত্তা, শিক্ষাজীবন এবং ভবিষ্যৎ পারিবারিক সম্পর্ক সম্পর্কে ধারণা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। সন্তানের মানসিক বিকাশের এই ক্ষতি কোনোভাবেই অপূরণীয় নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল সন্তানের মুখ চেয়ে একটি বিষাক্ত বা নির্যাতনমূলক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাও কোনো সমাধান নয়।

বিশ্লেষকদের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, "উচ্চশিক্ষা বা কর্মজীবী হওয়ার কারণে বিচ্ছেদ বাড়ছে—এমন সরল সমীকরণ টানার সুযোগ নেই। মূল সংকট হলো পারস্পরিক সহনশীলতা, ধৈর্য এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজার মানসিকতা কমে যাওয়া।"

সম্পর্ক ভাঙার আগে দাম্পত্য কাউন্সেলিং ও পারিবারিক সহায়তার সুযোগ বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। নগরজীবনের চাপ, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং ছাড় দেওয়ার মানসিকতার অভাবে যে হারে সংসার ভাঙছে, তা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর অশনিসংকেত।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ২৪ অক্টোবর ২০২৬