ঢাকা: দেশ থেকে অর্থ পাচার এবং ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং পাঁচটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ জোরদার করেছে সরকার। প্রথম ধাপে আদালতের নির্দেশে এই ছয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে দেশে-বিদেশে থাকা ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার সম্পদ জব্দ, সংযুক্ত বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

অভিযুক্ত পাঁচ শিল্পগোষ্ঠী হলো—চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ, সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপ এবং ওরিয়ন গ্রুপ।  দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সমন্বয়ে গঠিত ১১টি যৌথ তদন্ত দল এই পাচারকৃত অর্থের উৎস ও সম্পদ স্থানান্তরের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

আদালতের নির্দেশে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা সম্পদের মধ্যে শুধু জমি বা ভবন নেই; রয়েছে ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব, ট্রাস্ট এবং বিনিয়োগ তহবিলও।  দেশে-বিদেশে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

দেশে থাকা মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ৭৬৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকার।  বিদেশে থাকা স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১৫ হাজার ১২৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা ও মামলা
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদের অবস্থান শনাক্ত এবং তা দেশে ফিরিয়ে আনতে এ পর্যন্ত ১৬টি বিচারিক এলাকার (জ্যুরিসডিকশন) কাছে ৩০টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া, হংকং ও চীনের সঙ্গে আইনি সহায়তা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। 

এছাড়া, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, বিশ্বব্যাংকের চুরি যাওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার উদ্যোগসহ (স্টার) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ কাজ করছে।

অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এ পর্যন্ত দেশে ১৪২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে ১৫৮ জনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলার হাই-প্রোফাইল অভিযুক্তদের ধরতে ইন্টারপোলের কাছে ১০টি রেড নোটিশ জারির অনুরোধ পাঠানো হয়েছে।

বিদেশে টাকা পাচারে শীর্ষস্থানে রয়েছে এস আলম গ্রুপ
১২ বিলিয়ন ডলারের খেলাপি ঋণ: বিদেশে দেওয়ানি মামলা
শুধু ফৌজদারি মামলাই নয়, ব্যাংকগুলো তাদের আর্থিক ক্ষতি পুনরুদ্ধারে বিদেশে দেওয়ানি মামলা দায়েরের নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ উপর্যুক্ত পাঁচ গ্রুপের স্বার্থ-সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে সৃষ্ট আনুমানিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের খেলাপি ঋণ উদ্ধারে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই ছয় ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাতে আটটি ব্যাংককে প্রধান হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মামলা পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে ১০টি বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে।

প্রাথমিক এই তালিকার বাইরে নাভানা গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল, বসুন্ধরা গ্রুপ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামও অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে নিশানায় আরও ৪০ গ্রুপ
প্রথম ধাপের পর, ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের ঋণ এক্সপোজার রয়েছে এবং বিদেশে সম্পদ পাচার করেছে—এমন আরও ৪০টি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দ্বিতীয় ধাপের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এই ৪০ গোষ্ঠীর সঙ্গে আনুমানিক ২ বিলিয়ন ডলারের খেলাপি ঋণ জড়িত।

বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশ।” 

তিনি ২০১৬ সালের রিজার্ভ চুরির উদাহরণ টেনে সতর্ক করেন যে, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এর জন্য আন্তর্জাতিক আইনি প্রোটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করছে ‘অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’। তিনি বলেন, “টাকা একবার পাচার হয়ে অন্য দেশে ঢুকে গেলে আমাদের দেশীয় আইনে তা সরাসরি ফেরত আনা সম্ভব নয়। এ জন্য আন্তর্জাতিক ল’ ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অর্থ উদ্ধারে আইনি ও কূটনৈতিক—উভয় মাধ্যমকেই সমানভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।”

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ জেডআরসি/ ২৫ অক্টোবর ২০২৬