সংসদ নির্বাচনে পরাজিত দলীয় নেতাদের সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়েছে ক্ষমতাসীন সরকার। আর এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই নির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপি) এবং দলীয় প্রশাসকদের মধ্যে শুরু হয়েছে চরম আধিপত্য বিস্তারের লড়াই।

হাটবাজার ইজারা, সারের ডিলার নিয়োগ, খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে তৈরি হওয়া এই দুই পক্ষের প্রকাশ্য ও গোপন দ্বন্দ্বে এখন রীতিমতো পিষ্ট হচ্ছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ডিসি, এসপি, ইউএনও এবং থানার ওসিদের দৈনন্দিন কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপের ফলে দেশের বেশিরভাগ জেলা ও উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামোতে এক অচলাবস্থা ও ত্রাহি অবস্থা বিরাজ করছে।

নিয়োগ ও দ্বন্দ্বের নেপথ্য কারণ
স্থানীয় সরকার ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সরকার গঠনের পর কয়েক দফায় দেশের ৬০টি জেলা পরিষদ ও ১২টি সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। 

এছাড়া তিন পার্বত্য জেলা পরিষদেও অন্তর্বর্তী পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। শুধু প্রথম ধাপেই নিয়োগ পাওয়া ৪২ জেলা পরিষদের প্রশাসকের মধ্যে ১০ জন এবং সিটি করপোরেশনের তিনজন ছিলেন সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জনগণের প্রতি যে দায়বদ্ধতা থাকে, মনোনীত প্রশাসকদের মাঝে তা স্বাভাবিকভাবেই অনুপস্থিত। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োগ, প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ এবং কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে স্বতন্ত্র, জামায়াতে ইসলামী কিংবা ভিন্ন দল থেকে নির্বাচিত এমপিদের সঙ্গে এসব প্রশাসকদের স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

মাঠ প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের খণ্ডচিত্র
গাইবান্ধা-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর এ কে এম নজরুল ইসলামের কাছে হেরে যান জেলা বিএনপি সভাপতি সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক। পরবর্তীতে তাকে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। সম্প্রতি সারের ডিলার নিয়োগে এমপির সুপারিশ করা কেউ ডিলারশিপ না পাওয়ায় ডিসির কাছে কৈফিয়ত চান এমপি নজরুল ইসলাম। 

কিন্তু ডিসি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এমপি নজরুলের ভাষ্য, “ডিসি চাইলেও অনেক কিছুই করতে পারছেন না। ভোটে পরাজিত ডা. সাদিক প্রশাসক হয়ে সরাসরি সরকারি অফিসারদের কাজে হস্তক্ষেপ করছেন। অফিসাররা যেন একেবারেই অসহায়।”

রাজনীতি এখন রাজনীতিবিদদের হাতে নেই
একই চিত্র ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি)। ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের কাছে পরাজিত শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে ডিএনসিসির প্রশাসক করা হয়েছে। 

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুরে হকার উচ্ছেদ অভিযানের আগে স্থানীয় এমপি হিসেবে তাকে কিছুই জানানো হয়নি। মিল্টনের হস্তক্ষেপে প্রশাসন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

খুলনা-২ আসনে জামায়াতের শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের কাছে পরাজিত হয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হয়েছেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এমপি জাহাঙ্গীর হুসাইন বলেন, “প্রশাসক হওয়ায় তার একক প্রভাব তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা চাপের বিষয়টি ফিসফিস করে বললেও মুখ খুলতে ভয় পান।”

সাতক্ষীরার চারটি আসনেই জামায়াতের এমপি। এর মধ্যে সাতক্ষীরা-১ আসনে পরাজিত বিএনপি নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব এখন জেলা পরিষদের প্রশাসক। সেখানকার দুজন ইউএনও স্বীকার করেছেন, সারের ডিলার নিয়োগে এমপি এবং প্রশাসকের পাল্টাপাল্টি চাপে তারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। 

অন্যদিকে, রংপুর-৩ আসনে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ডিসি ও থানা ঘেরাওয়ের প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছেন জামায়াতের এমপি মাহবুবুর রহমান বেলাল।

টাঙ্গাইলের একটি আসনে নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীকে হারিয়ে জয়ী হন বিএনপির এক বহিষ্কৃত নেতা। এরপর পরাজিত প্রার্থীকে জেলা পরিষদের প্রশাসক করা হলে উভয়ের দ্বন্দ্বে চাপে পড়ে সেখানকার এক ইউএনও বাধ্য হয়ে বদলির তদবির করে ঢাকায় চলে আসেন। বর্তমানে তিনি একটি মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সচিব (পিএস)।

রাজনীতি ও প্রশাসন মুখোমুখি
রাজনৈতিক আক্রোশ ও পুলিশের অসহায়ত্ব
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এসপি ও ওসিদের অবস্থাও শোচনীয়। নোয়াখালী-৬ আসনে এনসিপি নেতা আব্দুল হান্নান মাসুদের কাছে পরাজিত মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান শামীমকে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এমপি মাসুদের অভিযোগ, শামীম অন্য জেলার প্রশাসক হয়েও তার এলাকায় প্রভাব খাটাচ্ছেন এবং তার অনুসারীদের ওপর হামলা হলেও প্রশাসনের নীরবতা প্রমাণ করে তারা কতটা চাপে আছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানার ওপর তিন দফা হামলার চেষ্টা হয়েছে। তিনি এই পরিস্থিতির জন্য প্রশাসনের অতিরিক্ত দলীয়করণকে দায়ী করেছেন।

অন্যদিকে, পুলিশ যে কতটা অসহায় তার প্রমাণ মেলে চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক একটি ঘটনায়। গত ৬ অক্টোবর নগর ভবনে অভিযান চালিয়ে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন বগাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করে পুলিশ। বগা সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হওয়ায় এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুলশী থানার ওসি আব্দুর রহিমকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।

বিশ্লেষক ও সরকারের বক্তব্য
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এই পরিস্থিতিকে সুশাসনের চরম অবনতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “দলীয় প্রশাসক নিয়োগ করে ক্ষমতাসীনরা সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের পাশাপাশি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘৩১ দফা’ থেকেও সরে এসেছে।”

মাঠপর্যায়ের এই ত্রাহি অবস্থা নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) রাহেদ হোসেন সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, “মাঠপর্যায়ের কেউ ব্যাপক চাপে রয়েছেন এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই। তবে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশাসনকে চলতে হয়, এটিই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।”

নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং পরাজিত দলীয় প্রশাসকদের এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মাঠ প্রশাসন যদি এভাবে জিম্মি হয়ে থাকে, তবে স্থানীয় উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামনে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ এজেসি/ জেডআরসি/ ২৫ অক্টোবর ২০২৬