ঢাকা: কাগজে-কলমে দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা, কিন্তু বাস্তবে সিলিন্ডারপ্রতি ক্রেতার পকেট কাটা যাচ্ছে প্রায় হাজার টাকা পর্যন্ত। দেশজুড়ে এলপি গ্যাসের তীব্র সরবরাহ সংকটের মধ্যেই রোববার (০৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে।

তবে এটি শুধুই একটি কাগুজে ঘোষণা। বাজারে গ্যাস মিলছে না, আর যেটুকু মিলছে তার জন্য ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ২,২০০ থেকে ২,৬০০ টাকার চড়া দাম।  সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও হুঁশিয়ারির ঠিক পরদিনই এমন মূল্যবৃদ্ধি প্রমাণ করছে— বাজার নিয়ন্ত্রকদের হাতে কোনো লাগাম নেই; বরং সাধারণ মানুষ পুরোপুরি বেসরকারি কার্টেলের দয়ার ওপর নির্ভরশীল।

কী ঘটছে এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আমদানিকারকদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করার ঠিক পরদিনই বিইআরসি এই দাম বাড়াল। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। বাস্তবে এসব নির্দেশনার কোনো প্রতিফলন বাজারে নেই।

সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল) তাদের ১২.৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৭৭৭ টাকায় অপরিবর্তিত রাখলেও, বাজারে তাদের অংশীদারিত্ব ২ শতাংশেরও কম। ফলে ৯৮ শতাংশ বোতলজাত গ্যাস ব্যবহারকারী সম্পূর্ণরূপে বেসরকারি পরিবেশকদের কাছে জিম্মি।

সংকটের নেপথ্য: পাইপলাইনের ঘাটতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত
জাতীয় গ্রিডে চরম গ্যাস সংকটই এলপিজির এই অস্বাভাবিক চাহিদার মূল কারণ। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দৈনিক ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে মাত্র ২,৬০০ এমএমসিএফডি। পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় বাসা-বাড়ি, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র শিল্প—সবাই এলপিজির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে।

আমদানি নিয়ে স্ববিরোধিতা: কারসাজির অভিযোগ। ছবি: সংগৃহীত
চাহিদার এই বিস্ফোরণের সুযোগ নিচ্ছে সরবরাহকারীরা। তারা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও পরিবহন ব্যয় (ফ্রেইট) বৃদ্ধির অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে। আমদানিকারকদের দাবি, বিইআরসি পরিবহন খরচ প্রতি টন ১৬০ ডলার ধরলেও, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় বাস্তবে তা ৪০০ ডলার ছুঁয়েছে। আর্থিক ক্ষতি এড়াতেই নাকি তারা আমদানি কমিয়েছে।

আমদানি নিয়ে স্ববিরোধিতা: কারসাজির অভিযোগ
আমদানিকারকদের এই দাবির মধ্যেই রয়েছে বড় অসঙ্গতি। সরকারি তথ্য বলছে, আগস্টের ১ লাখ ৬০ হাজার টন থেকে সেপ্টেম্বরে আমদানি কমে ১ লাখ ২০ হাজার টনে নেমেছে। তবে খোদ এলপিজি পরিচালকদেরই একটি অংশ জ্বালানি বিভাগে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, আমদানি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে। শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে ইচ্ছে করে জাহাজ থেকে গ্যাস খালাসে বিলম্ব করছে। এটি নিছক সাপ্লাই চেইন সমস্যা নয়, বরং সুপরিকল্পিত বাজার কারসাজির ইঙ্গিত দেয়।

কার্টেলের কাছে আত্মসমর্পণ
বিইআরসির এই ভূমিকাকে 'অবৈধ বাজার কারসাজির স্বীকৃতি' বলে তোপ দেগেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তাঁর মতে, খুচরা বাজারে সরকারি দাম বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এভাবে দাম বাড়ানো কেবল অসাধু সিন্ডিকেটকেই আইনি সুরক্ষা দেয়।

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁর মতে, দেশীয় গ্যাসের বিকল্প হিসেবে জাতিকে আমদানিনির্ভর এলপিজির দিকে ঠেলে দেওয়া হলেও, রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো 'বাফার স্টক' বা 'মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল' গঠন করা হয়নি।

শীতকাল ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানির স্বাভাবিক চাহিদা আরও বাড়বে। বাজার তদারকি, মজুত ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার এবং আমদানিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে, এই কৃত্রিম সংকট আগামী দিনগুলোতে সাধারণ ভোক্তাদের আরও নিদারুণ ভোগান্তির দিকে ঠেলে দেবে। বাজার কারসাজির নিরপেক্ষ তদন্ত এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং অপরিহার্য।

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬