নিমতলী থেকে ইনানীর টুপটুপ রিসোর্ট: ১১ বছরে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১,০৮২ জন; সরকারি-বেসরকারি ১১টি সংস্থার উদাসীনতা ও নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণে বাড়াপড়া অগ্নিনিরাপত্তা ঝুঁকি

ঢাকা : বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ড এখন আর কেবল আকস্মিক দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়; বরং প্রশাসনিক শিথিলতা ও অব্যवस्था থেকে জন্ম নেওয়া এক ভয়াবহ জাতীয় ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। 

পুরান ঢাকার নিমতলী থেকে শুরু করে কক্সবাজারের ইনানীতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ‘টুপটুপ রিসোর্ট’-এর অগ্নিকাণ্ড—প্রতিটি ঘটনার পরই কান্নার রোলে ভারী হয় আকাশ-বাতাস, কিন্তু বদলায় না চিত্র। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের বাৎসরিক হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত ১১ বছরে দেশে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৮২ জন এবং আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৯৫ জন। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, চিকিৎসা চলাকালীন মারা যাওয়াদের হিসাব না থাকায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

অনুমোদনহীন ভবনের মহোৎসব ও তদারকির অভাব

সম্প্রতি ইনানীর সমুদ্রসৈকত লাগোয়া পর্যটন কেন্দ্র ‘টুপটুপ রিসোর্ট’-এ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির পর জানা গেছে, কাঠের তৈরি তিনতলা এই রিসোর্টটি ফায়ার সার্ভিসের কোনো ধরনের অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল। বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ’, চুড়িহাট্টা, কিংবা বনানীর এফআর টাওয়ারের মতো প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডেই পরিলক্ষিত হয়েছে একই চিত্র।

সরকার গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডগুলোর পেছনে সরকারি ও বেসরকারি মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবহেলা রয়েছে। 

আগুনে পুড়ে ছাই মানুষের স্বপ্ন ...
ভবন নির্মাণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (যেমন—রাজউক, চউক), সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা, বিস্ফোরক পরিদপ্তর এবং কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের চরম উদাসীনতার কারণেই অগ্নিনিরাপত্তা ঝুঁকি দিন দিন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে।

১১ বছরের অগ্নিকাণ্ড ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন বছরে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ২০২৫ সাল: ৮৮ জন
  • ২০২৪ সাল: ১৪১ জন (বেইলি রোডের ট্র্যাজেডিসহ)
  • ২০২৩ সাল: ১০২ জন
  • ২০২২ সাল: ৯৮ জন (সীতাকুণ্ড বিএম ডিপোয় ৪৯ জনসহ)
  • ২০২১ সাল: ২১৯ জন (রূপগঞ্জের রূপগঞ্জ হাশেম ফুডে ৫২ জনসহ)
  • ২০২০ সাল: ১৫৪ জন
  • ২০১৯ সাল: ১৮৫ জন (চুড়িহাট্টায় ৮১ ও এফআর টাওয়ারে ২৫ জনসহ)
  • ২০১৮ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত: যথাক্রমে ১৩০, ৪৫, ৫২ ও ৬৮ জন।
    বিমানবন্দরের ভয়াবহ আগুনের অভিজ্ঞতা আমাদের কিছুই শেখাতে পারেনি?

অগ্নিকাণ্ডের মূল ৭ কারণ ও সুপারিশ বাস্তবায়নে স্থবিরতা

সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের জন্য প্রধান ৭টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে: 

১. ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ ও শর্টসার্কিট।

২. গ্যাস সিলিন্ডারের যত্রতত্র ব্যবহার ও লিকেজ।

৩. অসচেতনতা ও জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো।

৪. মশার কয়েল ও চুলার অনিয়ন্ত্রিত আগুন।

৫. কেমিক্যাল ও দাহ্য পদার্থের অবৈধ মজুত।

৬. ট্রান্সফরমার ও বয়লার বিস্ফোরণ।

৭. ভবনে পর্যাপ্ত ফায়ার এক্সিট, স্মোক ডিটেক্টর ও জরুরি সিঁড়ির অভাব।

অগ্নিদুর্ঘটনা রুখতে তদন্ত কমিটি স্থানীয় ‘বিট পুলিশিং’-কে ভিত্তি করে ১০টি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ‘অগ্নিনিরাপত্তা সচেতন কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করলেও বাস্তবে তা কোনো আলোর মুখ দেখেনি। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এ ধরনের কমিটি গঠনের উদ্যোগ বা বাস্তবায়নের বিষয়ে কিছুই জানাতে পারেননি।

ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের দাবি

অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস নোটিশ জারি করলেও কার্যকর ব্যবস্থা বা সিলগালা করার সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা না থাকাকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছে। তাদের নিজস্ব কোনো ম্যাজিস্ট্রেট না থাকা এবং জনবল সংকটের কারণে অভিযান পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটে।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান জানান, দেশে আইন ও নিরাপত্তার প্রতি শিথিলতার মানসিকতাই প্রধান সমস্যা। 

বিপদ না আসা পর্যন্ত অগ্নিনিরাপত্তায় বিনিয়োগ বা ভাবনার সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় একের পর এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড ঘটে চলেছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর দায় চাপানোর যে খেলা শুরু হয়, তা বন্ধ করে সমন্বিত জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে অগ্নিকাণ্ডের এই অশুভ চক্র থামানো সম্ভব নয়। 

নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ১৯ অক্টোবর ২০২৬