মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ৬৪৬ ডলার
- বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন: দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়েও বেশি বাংলাদেশের মাথাপিছু বিদেশি ঋণ
- দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ১১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, শীর্ষে সরকারি খাতের দায়
➤ বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ 'আন্তর্জাতিক ঋণ প্রতিবেদন ২০২৬' অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ১১ হাজার ৩৪৪ কোটি (১১৩.৪৪ বিলিয়ন) ডলারে পৌঁছেছে। ১৭ কোটি ৫৭ লাখ জনসংখ্যার ভিত্তিতে হিসাব করলে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬৪৬ ডলারে।
আগের বছরের তুলনায় মোট ঋণ বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। গত এক দশকে দেশের বৈদেশিক দেনা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে, যা ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ৩৮.৭৭ বিলিয়ন ডলার। তবে মাথাপিছু এই হিসাবটি কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত আর্থিক দায় নয়, বরং এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির একটি গড় নির্দেশক।
ঋণের খাতভিত্তিক চিত্র ও পাওনাদার
দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের সবচেয়ে বড় অংশই হলো সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ, যার পরিমাণ ৮৯.৫১ বিলিয়ন ডলার। এর বাইরে বেসরকারি খাতের অ-গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ৯.৮৭ বিলিয়ন ডলার এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১৪.০৬ বিলিয়ন ডলার।
সরকারি ঋণের মধ্যে বহুপাক্ষিক দাতা সংস্থাগুলোর পাওনা ৫১.১৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) পাওনা সর্বোচ্চ ২২.৬৪ বিলিয়ন এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পাওনা ১৭.৫২ বিলিয়ন ডলার। অন্যান্য বহুপাক্ষিক পাওনাদারের পরিমাণ ১০.৯৯ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনৈতিক সূচকে ঋণের প্রভাব
প্রতিবেদনের সূচক বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল মোট রপ্তানি আয়ের ২১০ শতাংশ, যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৬.৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ঋণ ও মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) অনুপাত ৫.৯ শতাংশ বেড়ে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, রপ্তানি ও জাতীয় আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ কিছুটা কমেছে। রপ্তানির বিপরীতে ঋণ পরিশোধের হার ৩.১ শতাংশ কমে ১৬ শতাংশে এবং জাতীয় আয়ের বিপরীতে ৩.৮ শতাংশ কমে ২ শতাংশে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের স্থূল বৈদেশিক ঋণ আরও বেড়ে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
মাথাপিছু বিদেশি ঋণের দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়েও এগিয়ে আছে। ২০২৫ সালে এ অঞ্চলের ১৬৯ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ৯৫৫ বিলিয়ন ডলার, যার মাথাপিছু গড় প্রায় ৫৬৪ ডলার। ভারতের মাথাপিছু ঋণ প্রায় ৫২২ ডলার এবং নেপালের ৪০১ ডলার, যা বাংলাদেশের (৬৪৬ ডলার) চেয়ে কম।

অন্যান্য আঞ্চলিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২৫ কোটি ৫২ লাখ জনসংখ্যার পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক ঋণ ১৩৫.১১ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু ঋণ ৫২৯ ডলার। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের মোট ঋণ ২.২ শতাংশ বেড়ে ৩.৪২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বৈশ্বিক ঋণ পরিস্থিতি
বিশ্বব্যাপী নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর মোট বৈদেশিক ঋণ ২০২৫ সালে ৫.৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৯.৪ ট্রিলিয়ন (৯ লাখ ৪০ হাজার কোটি) ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি। এই সময়ে দেশগুলো ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ ও উন্নয়ন তথ্য বিভাগের পরিচালক হাইশান ফু বলেন, "নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রত্যাবর্তন অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এই দেশগুলো ঋণ নিচ্ছে বেশি, পরিশোধ করছেও বেশি।
ফলে বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য খুব কম সম্পদই অবশিষ্ট থাকছে।" সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার যোগ্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে ঋণের বোঝা আরও দ্রুত বেড়েছে; এসব দেশের বৈদেশিক ঋণ ৮.১ শতাংশ বেড়ে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ◉
নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০৮ নভেম্বর ২০২৬