ভারতে নির্বাসিত থেকে নতুন বার্তা

  • মৃত্যুদণ্ডের পরোয়া নেই, কোনো দেশের আশীর্বাদও চাই না: শেখ হাসিনা
  • ‘আকাশ হবে ছাদ, মাটি হবে ঘর’: সব শঙ্কা উড়িয়ে ডিসেম্বরেই দেশে ফিরছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী
  • ‘দূরে বসে মানুষের কষ্ট দেখতে চাই না, দেশে ফিরলেই উগ্রবাদ মোকাবিলা’

➤ গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটানো বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়েই তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। দেশে ফেরার জন্য কোনো বিদেশি শক্তির আশীর্বাদ তার প্রয়োজন নেই বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এই অনড় অবস্থানের কথা জানান। 

এপির বাংলাদেশ প্রতিনিধি জুলহাস আলমের পাঠানো লিখিত প্রশ্নের জবাবে গত বুধবার (৪ নভেম্বর) ই-মেইলের মাধ্যমে তিনি এসব কথা বলেন। তবে ঠিক কবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তিনি দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা তিনি দেননি।

মৃত্যুদণ্ড ও গ্রেপ্তারের শঙ্কা 

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় প্রাণঘাতী অভিযান চালানোর অভিযোগে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। সেই আন্দোলনে শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানালেও, ভারত এখন পর্যন্ত তাকে হস্তান্তর করেনি।

দেশে ফিরলে নিশ্চিত কারাবরণ ও প্রাণনাশের শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন ফিরতে চাইছেন—এপির এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, "আমি জানি দেশে ফিরলে আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে, নির্যাতন করা হতে পারে—এমনকি হত্যাও করা হতে পারে। 

সত্যিই কী দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা-এমনই প্রশ্ন সবার মনে ...
এসব সম্ভাবনা সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। কিন্তু দূর থেকে আমার মানুষকে কষ্ট পেতে দেখে বাকি জীবন কাটাতে পারব না। মৃত্যুই যদি আমার ভাগ্যে লেখা থাকে, তবে আমি নিজের দেশের মাটিতে, নিজের মানুষের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করতে চাই।"

সম্প্রতি প্রবাসী সাংবাদিক সুলতানা রহমানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশে থাকার মতো নিজস্ব কোনো বাড়ি না থাকার বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, "আকাশ হবে আমার ছাদ, আর মাটি হবে আমার ঘর। দেশের মানুষের ভালোবাসা ও দোয়াকেই আমি সম্বল হিসেবে বেছে নিয়েছি।"

‘বিদেশি শক্তির আশীর্বাদ প্রয়োজন নেই’ 

নিরাপদে দেশে ফেরার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর কোনো সাহায্য তিনি নেবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, "আমি সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিই। কিন্তু নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য কোনো বিদেশি শক্তির আশীর্বাদ বা সুরক্ষা আমার প্রয়োজন নেই।"

রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আওয়ামী লীগের সংকট 

শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করে। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল জয় নিয়ে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তারেক রহমান। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা হয় কারাবন্দি, না হয় আত্মগোপনে বা নির্বাসনে রয়েছেন। শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, "২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অন্তত ২০ হাজার নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সমর্থকদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিত হামলা চালানো হচ্ছে। দেশে এখন কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই।"

মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়েই ফিরতে চান তিনি
হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থাও সম্প্রতি নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তারেক রহমান সরকারের সমালোচনা করেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কেবল সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অভিযোগের ভিত্তিতেই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ

 ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সময় থেকেই দেশে উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোর উত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। শেখ হাসিনা দাবি করেন, তার ১৫ বছরের শাসনামলে উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে কঠোর হাতে দমন করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ এই গোষ্ঠীগুলোকে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে, যা দেশের সংখ্যালঘু ও উদারপন্থি মানুষের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার এবং দেশে ফেরার ঘোষণার বিষয়ে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ও মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। ◉ 

নিউজ নাউ বাংলা/ এজেসি/ এফওয়াই/ এমআরকে/ ০৬ নভেম্বর ২০২৬