চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক টার্মিনাল, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। গত ০৮ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ বছর মেয়াদি ‘কনসেশন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তির ফলে একদিকে যেমন বন্দরের আধুনিকায়ন ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রসারের স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তেমনি জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং ভূরাজনৈতিক জটিলতা নিয়েও জোরালো বিতর্ক শুরু হয়েছে।
উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই এই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—ভূরাজনীতিতে এই চুক্তির আসল অর্থ কী, বাংলাদেশের লাভ কতটুকু, আর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ঘিরেই বা এত সমালোচনা কেন?
কেন গুরুত্বপূর্ণ এনসিটি?
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি হলো সবচেয়ে আধুনিক এবং একে বন্দরটির ‘হৃৎপিণ্ড’ বলা হয়। ২৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনালে ১৪টি গ্যান্ট্রি ক্রেন রয়েছে, যা দেশের অন্য কোনো টার্মিনালে নেই। ১ হাজার মিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি জাহাজ নোঙর করতে পারে।
প্রতিবছর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ কনটেইনার ওঠানামা হয়, যার ৪৪ শতাংশই হ্যান্ডল করে এনসিটি। সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো, এই টার্মিনালের পাশেই অবস্থিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সর্ববৃহৎ ঘাঁটি ‘ঈশা খাঁ’।

চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড আগামী ১০ বছরে এনসিটিতে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং আধুনিকায়নে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে। সরকারি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর তথ্যমতে, এই চুক্তির ফলে টার্মিনালের গড় আয়ের ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ রয়্যালটি হিসেবে পাবে বাংলাদেশ সরকার। এর পাশাপাশি প্রতিবছর নির্দিষ্ট ফি হিসেবে প্রায় ১০ কোটি টাকা প্রদান করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯২ শতাংশ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। কিন্তু আধুনিকায়ন ও দক্ষতার অভাবে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা, অর্থাৎ বছরে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়। আশা করা হচ্ছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনায় কনটেইনারের অবস্থানকাল যদি মাত্র এক দিনও কমানো যায়।
তবে দেশের রপ্তানি ৭.৪ শতাংশ বাড়তে পারে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এসা কাজিমের মতে, এই চুক্তির ফলে এনসিটি তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে, যা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সংযোগকে আরও সহজ করবে।
ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ
এই চুক্তির একটি বড় ভূরাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় নির্ভরতা চীনের ওপর। ১৫টি দেশ থেকে যন্ত্রপাতি এলেও ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই আসে চীন থেকে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ‘লগইংক’ নামক একটি চীনা লজিস্টিকস সফটওয়্যার ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগর এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর নিয়ে ভারতের নিজস্ব ভূকৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। গত বছর মোংলা বন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ দিল্লির জন্য ‘উদ্বেগের কারণ’ হয়েছিল।
তবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটির দায়িত্ব যাওয়ায় ভারত কৌশলগতভাবে স্বস্তিতে থাকতে পারে। কারণ, ভারতেও ডিপি ওয়ার্ল্ড আমদানি-রপ্তানির বড় একটি অংশ পরিচালনা করে এবং দিল্লির সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গভীর।

সমালোচকদের উদ্বেগ ও নিরাপত্তা শঙ্কা
চুক্তিটিকে ঘিরে শুরু থেকেই তীব্র সমালোচনা চলছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের মতে, নৌবাহিনীর ‘ঈশা খাঁ’ ঘাঁটির কাছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল দেওয়া দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এই চুক্তিকে ‘উন্নয়নের নামে নব্য উপনিবেশায়ন’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “কাগজে মালিকানা বাংলাদেশের থাকলেও নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন ক্ষমতাই প্রকৃত মালিকানা। বিশ্বের কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্র নিজেদের প্রধান বন্দরকে এভাবে বিদেশিদের হাতে তুলে দেয় না।”
ডিপি ওয়ার্ল্ডের অতীত রেকর্ড নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। জিবুতিতে বন্দর পরিচালনার সময় তারা একচেটিয়া শর্ত চাপিয়েছিল এবং পরে চুক্তি ভঙ্গের দায়ে জিবুতি সরকারকে ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে হয়েছিল। এমনকি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যেও প্রতিষ্ঠানটির বিতর্কিত লবিং নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির অবশ্য এসব সমালোচনা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তি। মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ চাইলে চুক্তি নবায়ন কিংবা বাতিল করতে পারবে। একে দেশ বিক্রির চুক্তি বলাটা অমূলক।”
আগামীর চ্যালেঞ্জ
বিদেশি কোম্পানির ওপর একচেটিয়া নির্ভরশীলতা যাতে তৈরি না হয়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। চুক্তিতে ‘কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (কেপিআই)’ এবং লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে আর্থিক জরিমানার শর্ত রয়েছে।
এনসিটির সফল আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে হলে কঠোর তদারকি, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং কাস্টমস ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে চুক্তির শর্তগুলো শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে লাভের চেয়ে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থেকে যাবে।
নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১০ অক্টোবর ২০২৬