ধারাবাহিকভাবে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাসের ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন চরম মাত্রায় আমদানিনির্ভর। গত ছয় বছরে জাতীয় গ্রিডে দেশীয় কূপ থেকে গ্যাসের সরবরাহ প্রায় ৩৪ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে ঘাটতি মেটাতে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ বাড়াতে হয়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। 

বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহকৃত মোট গ্যাসের প্রায় ৩৮ শতাংশই আসছে এলএনজি থেকে। উৎপাদন না বাড়ালে ২০৩০ সাল নাগাদ গ্যাস সরবরাহে এলএনজির অংশ ৬০-৭০ শতাংশে পৌঁছতে পারে, যা সামষ্টিক অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং শিল্প খাতের জন্য এক ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করবে।

সরবরাহ ও ঘাটতির ছয় বছরের চিত্র
পেট্রোবাংলার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশীয় উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে এলএনজির ওপর নির্ভরতা কীভাবে বেড়েছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ২০২০: মোট সরবরাহ ৩,১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট (দেশীয়: ২,৪৪৭, এলএনজি: ৭০২)
  • ২০২১: মোট সরবরাহ ৩,২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট (দেশীয়: ২,৩৩৬, এলএনজি: ৮৯৪)
  • ২০২২: মোট সরবরাহ ২,৭৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট (দেশীয়: ২,২৭৪, এলএনজি: ৪৮৪)
  • ২০২৩: মোট সরবরাহ ২,৯০২ মিলিয়ন ঘনফুট (দেশীয়: ২,১০৬, এলএনজি: ৭৯৬)
  • ২০২৪: মোট সরবরাহ ২,৫৩২ মিলিয়ন ঘনফুট (দেশীয়: ২,০০২, এলএনজি: ৫৩০)
  • ২০২৫: মোট সরবরাহ ২,৭৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট (দেশীয়: ১,৭৮৪, এলএনজি: ৯৬৯)
  • ২০২৬: মোট সরবরাহ ২,৬২৩ মিলিয়ন ঘনফুট (দেশীয়: ১,৬২০, এলএনজি: ১,০০৩)

বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। কিন্তু সম্প্রতি গ্রিডে সর্বোচ্চ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ২,৫৭৬ মিলিয়ন ঘনফুট, যার অর্থ ঘাটতি প্রায় ১,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

২০৩০ সাল নাগাদ গ্যাস সরবরাহে এলএনজির অংশ ৬০-৭০ শতাংশে পৌঁছতে পারে ...
ভর্তুকি ও ব্যয়ের চাপে ধুঁকছে অর্থনীতি
দেশীয় গ্যাস কমায় এলএনজির পেছনে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। এই সময়ে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বছরের শুরুর ১০-১২ ডলার থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে প্রায় ৩০ ডলারে (প্রতি এমএমবিটিইউ) ঠেকেছে। কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেটের ওপর চাপ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসেই এলএনজি খাতে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে, যেখানে পুরো বছরের বরাদ্দই ছিল ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মত: ভুল নীতির মাশুল
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম এই আমদানিনির্ভরতাকে দীর্ঘদিনের ভুল নীতির ফসল বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “এলএনজি আমদানির পেছনে ব্যয় করা বিপুল অর্থের মাত্র ১০ শতাংশও যদি দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননে বিনিয়োগ করা হতো, তবে আজ এই আমদানিনির্ভরতা তৈরি হতো না।”

তার মতে, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো এখন ক্রমহ্রাসমান (ডিক্লাইনিং) পর্যায়ে। শুধু বাপেক্সের ওপর নির্ভর না করে উৎপাদন ধরে রাখতে শেভরনের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কাজে লাগানো জরুরি।

উত্তরণের উদ্যোগ: ১৫০ কূপ ও সমুদ্রে অনুসন্ধান
পেট্রোবাংলার হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৯.৭৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদের মধ্যে ৩০ জুন পর্যন্ত ২২.৪১ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৭.৩৭ টিসিএফ গ্যাস।

সংকট মোকাবেলায় সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যা থেকে দৈনিক অতিরিক্ত ১,৪০১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, সাইসমিক ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন প্রসপেক্ট শনাক্ত করা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি, বঙ্গোপসাগরে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’ এর দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বর দরপত্র জমার শেষ দিন। উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) সংশোধন করে আর্থিক সুবিধা বাড়ানোয় টার্কিশ পেট্রোলিয়াম ওভারসিজ কম্পানি (টিপিএও) সহ অন্তত ১০টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তথ্য প্যাকেজ কিনেছে।

২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছিল দেশীয় গ্যাসের পরিপূরক হিসেবে। কিন্তু গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার কারণে মাত্র কয়েক বছরেই সেই এলএনজি পরিণত হয়েছে জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার মূল ভরসায়, যা এখন অর্থনীতির গলার কাঁটা।

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ০৯ অক্টোবর ২০২৬