➤ তেজগাঁওয়ে গ্রেপ্তার ২৩: খেলাফত প্রতিষ্ঠার ছকে নতুন জঙ্গি দল, অধরা জেল-পালানো শীর্ষ জঙ্গিরা
➤ রক্ষীবাহিনীতেও উগ্রবাদের থাবা: জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটনে সরকারের জিরো টলারেন্স


➤ বাংলাদেশে ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি জঙ্গি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের একটি মসজিদে গোপন বৈঠক চলাকালে গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। 

বিদেশি কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে এই নতুন দলের সংযোগ রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে।

তেজগাঁওয়ে অভিযান ও ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’র ছক
গত ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) জুমার নামাজের পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তেজগাঁও কলেজের মসজিদে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে গোপন বৈঠক চলাকালে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ২৩ জনকে আটক করা হয়। পরে গভীরতর তদন্তের জন্য অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) তাদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ নতুন এই জঙ্গি দলের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করে জানান, "তেজগাঁও থেকে হেফাজতে নেওয়া ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদে ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনার তথ্য মিলেছে। খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তারা এই উগ্রবাদী তৎপরতায় সংগঠিত হচ্ছিল।" তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, "এ ধরনের উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স রয়েছে।"

যেকোনো ধরনের নাশকতা নস্যাৎ করতে প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ...
নাশকতা ও অস্থিতিশীলতার চেষ্টা
গোয়েন্দা সূত্রগুলোর ধারণা, নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করতে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তি ও মৌলবাদীরা পর্দার আড়াল থেকে জঙ্গিদের ইন্ধন জোগাচ্ছে। তেজগাঁওয়ে জঙ্গিদের গ্রেপ্তারের ঠিক পরের দিন, ১৯ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ঢাকার মিরপুর ও মধ্য বাড্ডায় তিনটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। 

একই দিন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি পিকআপ ভ্যানেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরদিন রবিবার রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর পূর্বপরিকল্পিত ছক বলেই মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, "দেশে জঙ্গি রয়েছে এবং জঙ্গি তৎপরতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সরকার নিরলস কাজ করছে।"

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জেল-পালানো জঙ্গিরা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার ভেঙে অন্তত ৬৯০ জন বন্দি পালিয়ে যায়, যা বর্তমান নিরাপত্তায় একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেন জানান, পলাতকদের মধ্যে ৯ জনের বিরুদ্ধে একাধিক জঙ্গি মামলা ছিল। এদের মধ্যে ৬ জনকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ৩ জন দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

কারা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরেও শুধু নরসিংদী কারাগার ভেঙে অন্তত ২৭ জন জঙ্গি পালিয়েছে বলে জানা গেছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, খোলা আকাশের নিচে থাকা এই জেল-ছুট জঙ্গিরাই মৌলবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’র মতো নতুন সংগঠন গড়ে তুলছে।

দেশে আর কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী মাথাচাড়া দিতে পারবে না ...
সামরিক বাহিনীতে অনুপ্রবেশের শঙ্কা
জঙ্গিবাদের শেকড় যে কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তার প্রমাণ মেলে বিমানবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর এক সদস্যের ঘটনায়। চলতি বছরেই চট্টগ্রামের একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক ওয়ারেন্ট অফিসারের সন্ধান মিলেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) আস্তানায়। 

পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি বাংলাদেশকে জানিয়েছে, তাদের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে টিটিপির হয়ে ওই বাংলাদেশি কাজ করছিলেন। এ ঘটনার পর সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্রপন্থি নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে জোর অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

বিশেষজ্ঞ মত ও সতর্কতা
বাংলাদেশে উগ্রবাদের এই উত্থান-চেষ্টা নিয়ে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "বাংলাদেশে উগ্রবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়। গত প্রায় দুই বছরে এ ধরনের গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড কতটা কার্যকরভাবে নজরদারিতে ছিল, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখন তারা যে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, তার স্পষ্ট আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি।"

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মতে, দেশকে পুরোপুরি উগ্রবাদমুক্ত করতে হলে অঙ্কুরেই এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে হবে। বিদেশের অর্থ ও সহায়তায় ধর্মের নামে যারা বিস্তার লাভ করছে এবং মাদরাসার মাধ্যমে শিশুদের মননে জঙ্গিবাদের বীজ বপন করছে, তাদের প্রতিহত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। ◉

নিউজ নাউ বাংলা/ এফওয়াই/ জেডআরসি/ ১৩ অক্টোবর ২০২৬