বাংলাদেশে এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে এবং চাকরি হারানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারীরা। একই সময়ে দুর্বল ব্যাংক খাত, জ্বালানিসংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও কম রাজস্ব আদায় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে।
মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর ) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে অর্থনীতির এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে।
বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমায় দেশে দারিদ্র্যের হার এক বছরে ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। এতে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন। জাতীয় দারিদ্র্যসীমার হিসাবেও টানা চতুর্থ বছরের মতো দারিদ্র্য বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের শ্রমবাজারেও সংকট আরও প্রকট হয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়েছে এবং নারীরা কর্মসংস্থান হারানোর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে হলে নতুন ও ভালো মানের চাকরি তৈরির ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতাকে অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশের সমান ছিল, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন। রাজস্ব কম থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যয় করার ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত এবং সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান তৈরির জন্যও এসব সংস্কার জরুরি।
বিশ্বব্যাংক মনে করছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে আটকে থাকতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রম গতি পেলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। তবে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও উৎপাদন দ্রুত ঘুরে না দাঁড়ালে এই পুনরুদ্ধারও দুর্বল থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বড় ঘাটতিও তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করলেও সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে না। অন্যদিকে তুলনামূলক সচ্ছল অনেক পরিবার এসব সুবিধার আওতায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন, সুবিধাভোগী নির্বাচনে তথ্যের ব্যবহার এবং খাদ্যভিত্তিক একাধিক ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির কার্যকর সমন্বয় এবং সুবিধাভোগী নির্বাচন উন্নত করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে।
তবে অর্থনীতির বহিঃখাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। শক্তিশালী প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি এতে ভূমিকা রেখেছে। একই দিনে প্রকাশিত দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, চলতি বছর এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
২০২৭ সালে তা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগাতে দক্ষতা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
নিউজ নাউ বাংলা/ এমআরকে/ জেডআরসি/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬